প্রশংসায় ভাসছে 'কুয়াশায় হাতি'
বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম সংস্করণে এক অনবদ্য ইতিহাস গড়েছে নেপালের সিনেমা। তরুণ নির্মাতা অবিনাশ বিক্রম শাহের পরিচালনায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ (কুয়াশায় হাতি) কান উৎসবের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘আঁ সর্তে রিগা’ বা ‘বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি’ শাখায় মর্যাদাপূর্ণ ‘জুরি পুরস্কার’ জিতে নিয়েছে। নেপালের ইতিহাসে এর আগে কোনো চলচ্চিত্র এই বিশ্বমঞ্চের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হতে পারেনি এবং পুরস্কার জেতার নজিরও এবারই প্রথম। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এই গৌরবময় অর্জন কেবল নেপালের নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের জন্য এক বিশাল মাইলফলক।
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই সমভূমির বনাঞ্চল ঘেরা গ্রাম 'থোরি'-র পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিটির মূল উপজীব্য সমাজের প্রান্তিক হিজড়া বা রূপান্তরিত নারী সম্প্রদায়ের যাপনচিত্র। গল্পের মূল চরিত্র ‘পীরতি’ নামের এক রূপান্তরিত নারী, যিনি নিজের চেনা সমাজ ছেড়ে ভালোবাসার মানুষের সাথে এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আচমকা তাঁর সম্প্রদায়ের এক তরুণী নিখোঁজ হওয়ার পর পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতি সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যকার চরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই এই সিনেমার মূল চালিকাশক্তি।
নির্মাতা অবিনাশ বিক্রম শাহ পুরস্কার গ্রহণের সময় তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পূর্ব অঞ্চলের এই মানুষদের জীবনকে মূল সমাজ থেকে অদৃশ্য করে রাখা হয়েছিল। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরা সেই অন্ধকার প্রান্তকে বিশ্বমঞ্চের আলোর নিচে নিয়ে আসতে পেরেছি এবং অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করেছি।
উৎসবের প্রিমিয়ার শো বা উদ্বোধনী প্রদর্শনীতেই চলচ্চিত্রটি উপস্থিত বিশ্বখ্যাত নির্মাতা ও দর্শকদের কাছ থেকে টানা সাত মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন লাভ করে, যা কান উৎসবের অন্যতম বড় সম্মান হিসেবে গণ্য করা হয়। বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন, নেপালি চলচ্চিত্র এই ছবির মাধ্যমে এক বিশাল এক লম্ফ দিল। এ এক অগ্রযাত্রা।
নেপাল, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রাজিল এবং নরওয়ের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিটিতে অভিনয় করেছেন পুষ্প থিং লামা, দীপিকা যাদব, জেসমিন বিশ্বকর্মা-সহ একঝাঁক নতুন শিল্পী, যাঁদের বাস্তবসম্মত অভিনয় পুরো সিনেমাটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর কাঠমান্ডুর উপ-মেয়রসহ নেপালের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে নেপালি চলচ্চিত্রের এক আবেগঘন ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত বলে অবিহিত করেছেন।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়া টুডে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।