দুর্নীতি থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এমন নানা অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করছেন দলের একাধিক নেতা। এই ক্ষোভ এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলটিকে বড় ধরনের বিপাকে ফেলেছে।
২০০৯ সাল থেকে মমতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চারবারের সংসদ সদস্য শতাব্দী রায় দাবি করেছেন, ‘দিদি’ হিসেবে পরিচিত তৃণমূল প্রধান মমতা গত কয়েক বছরে অনেকটাই ‘বদলে গিয়েছিলেন’, যা তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শতাব্দী বলেন, ‘দিদি বদলে গিয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছিল। তার সঙ্গে আমার একটা আবেগীয় সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু আমার কাছে কাজটাই আসল। আর সে কারণে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তৃণমূলের দলত্যাগী সংসদ সদস্যদের একটি অংশ গতকাল সোমবার বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সকে (এনডিএ) সমর্থনের প্রস্তাব দেন। প্রায় এক ডজন সংসদ সদস্যের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন শতাব্দী রায়।
এর মধ্য দিয়ে দলটির সঙ্গে তাদের সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে এলো।
তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের চিফ হুইপ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, তাদের এই শিবিরে ক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যের সংখ্যা এখন ২০-এ পৌঁছেছে।
নিজের দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে শতাব্দী এনডিটিভিকে বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করতে না পারা বা দূরত্ব তৈরি হওয়াই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, যা তাদের কাজকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে।
শতাব্দীর দাবি, ক্ষমতায় থাকাকালে কেবল হাতেগোনা কয়েকজন নেতাই দলের সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। বাকিদের গুরুত্বই দেওয়া হতো না।
পশ্চিমবঙ্গের লোকসভার এই সংসদ সদস্য জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি দল ছাড়ছি, কারণ আমাদের কথা শোনার মতো কেউ ছিল না। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেনি। শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষেরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল।’
বিদ্রোহী শিবিরের একাধিক সূত্রও একই ক্ষোভের কথা জানিয়ে বলেছে, মমতা সরকারের মন্ত্রীরাও সংসদ সদস্যদের সময় দিতেন না। তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করতেন। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হতো না। গত কয়েক বছরে তারা যখনই মুখ খোলার চেষ্টা করেছেন, তখন তাদের চুপ করে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
শতাব্দী বলেন, ‘অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, দল যখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে, ঠিক তখন কেন তারা এতদিনের নীরবতা ভেঙে এই বিষয়গুলো নিয়ে সরব হচ্ছেন। এর কারণ, পরিস্থিতি এখন দিন দিন পরিষ্কার হচ্ছে। তৃণমূল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কী কী ঘটেছে তা আমরা দেখেছি। পরিস্থিতি এখন আমি বুঝতে পারছি। তবে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থেই আমাকে এই পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।’
জনপ্রিয় অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিক হওয়া শতাব্দী গত কয়েক দিন ধরে দলের অন্য নেতাদের মতো দুর্নীতির অভিযোগে সরব হয়ে বলেন, ‘তৃণমূলে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। একদম নিচুতলা থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত যেভাবে দুর্নীতি হয়েছে, তা দেখে আমি খুবই হতাশ।’
তিনি জানান, নিজের ভাবমূর্তি বাঁচাতে দলের আশ্রয় নিতে হয়, এমন দুর্নীতিবাজ নেতা তিনি নন।
‘আমার ভাবমূর্তি আগে থেকেই পরিষ্কার,’ বলেন শতাব্দী।