একসময় উত্তাল স্রোত আর গর্জনে কাঁপত দুই কূল। বর্ষায় ভয়াল রূপ, শুষ্ক মৌসুমে প্রাণবন্ত নাব্যতা— এই ছিল যমুনা নদীর পরিচয়। কিন্তু আজ গোপালপুর ও ভূঞাপুর অঞ্চলে সেই যমুনাই হারাতে বসেছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও যৌবনের উচ্ছ্বাস। নদীর বুকে জেগে উঠছে অসংখ্য চর; অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পের চাপে সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীর গতিপথ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাড়াকান্দি এলাকা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং নদীর স্বাভাবিক স্রোতকে ব্যাহত করছে। ফলে কোথাও কোথাও নদী ভরাট হয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন চর, আবার বর্ষায় হঠাৎ বৃদ্ধি পাচ্ছে ভাঙন। এতে নদীতীরবর্তী বসতি ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ঐতিহ্যবাহী নদীবন্দরভিত্তিক বাজারগুলোতে— সোনামুই বাজার, নলিন বাজার ও গোবিন্দাসী বাজারে। একসময় নৌপথে পণ্য আনা-নেওয়ার প্রধান কেন্দ্র ছিল এসব বাজার। কৃষিপণ্য, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বেচাকেনায় সরগরম থাকত জনপদ। এখন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ। ফলে বাজারগুলোর জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
সোনামুই বাজারের ব্যবসায়ী শিমুল পারভেজ বলেন, আগে প্রতিদিন নৌকায় মালামাল আসত। এখন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই পথ বন্ধ। পরিবহন খরচ বেড়েছে, বিক্রি কমেছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নলিন বাজারের রফিক ডাক্তার জানান, নদীপথের যোগাযোগ না থাকায় আশপাশের গ্রামের মানুষ সহজে বাজারে আসতে পারে না। এতে রোগী ও সাধারণ ক্রেতা— সবারই ভোগান্তি বাড়ছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মতে, লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব বাজারের ওপর নির্ভরশীল। নদীপথের যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় অনেককে দীর্ঘ পথ ঘুরে বাজারে আসতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকসমাজ।
যমুনা সেতু নির্মাণের সময় নদীশাসনের নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে রেলসেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো স্থাপনের ফলে নদীর স্বাভাবিক বিস্তার আরও সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পিত খননের অভাব এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্ষাকালে উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা ও ভাঙন দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গিয়ে কৃষি ও মৎস্যখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চর জেগে উঠলে সেখানে বসতি গড়ে ওঠায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনাকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত ড্রেজিং, নদীতীর রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, শিল্পবর্জ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি নদীভিত্তিক প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
যমুনা শুধু একটি নদী নয়; এটি গোপালপুর ও ভূঞাপুরের জীবনরেখা। নদীর যৌবন নিঃশেষ হলে হারাবে বাজারের প্রাণ, বিপন্ন হবে লক্ষ মানুষের জীবিকা। এখনই সময় সমন্বিত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেওয়ার— নইলে ইতিহাস হয়ে যাবে এই জনপদের হারানো নদী ও নিভে যাওয়া বাজারের জুলুস।