প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজছিলেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পাগলা শ্যামনগর গ্রামের যুবক হাফেজ আব্দুস সামাদ শেখ। আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ইউটিউবে গ্র্যান্ড নাইন (জি-নাইন) জাতের কলার বাণিজ্যিক চাষের একটি ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন। সেই অনুপ্রেরণাকেই কাজে লাগিয়ে মাত্র আট মাসে তিনি গড়ে তুলেছেন সফল একটি কলা বাগান, যা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সামাদ শেখ জানান, ইউটিউব থেকে ধারণা পাওয়ার পর তিনি উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলেও প্রয়োজনীয় চারা পাননি। পরে নলধা-মৌভোগ এলাকার এক কৃষকের কাছ থেকে ২১০টির বেশি গ্র্যান্ড নাইন কলার চারা সংগ্রহ করে নিজের ১৩ কাঠা পতিত জমি উঁচু করে রোপণ করেন।
তিনি বলেন, পুরো বাগান করতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যার ফলে মাত্র আট মাসেই গাছে ফল এসেছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গাছে বড় বড় কাঁদি ঝুলছে। একেকটি কাঁদিতে ২০০ থেকে ২৮০টি পর্যন্ত কলা ধরেছে। ফলের অতিরিক্ত ওজনে গাছ যাতে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
সামাদ আরও জানান, আর এক সপ্তাহের মধ্যেই কলা বাজারজাত করা যাবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা বাগানে এসে যোগাযোগ করছেন। বর্তমানে ফলন অনুযায়ী অন্তত আড়াই লাখ টাকার কলা বিক্রির আশা করছেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গ্র্যান্ড নাইন কলার চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সামাদের এই সফলতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার বাগানে এসে ভিড় করছেন। বিশাল আকৃতির কলার কাঁদি দেখতে বাগানটি স্থানীয়দের কাছে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ মোল্লা বলেন, ‘সামাদ ভাইয়ের কলা বাগান দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হয়েছি। এত বড় কাঁদি আগে দেখিনি। আমিও এই জাতের কলার চাষ করার পরিকল্পনা করছি।’
কৃষক আবুল কালাম বলেন, ‘বিভিন্ন বাগানের ফলন দেখে আমি উৎসাহিত হয়েছি। আগামী মৌসুমে আমিও গ্র্যান্ড নাইন কলার চাষ শুরু করব।‘
পরীক্ষামূলক চাষি সৈয়দ আলী বলেন, ‘গত বছর অন্য এক কৃষকের সফলতা দেখে আমিও পরীক্ষামূলকভাবে জি-নাইন কলার চাষ করেছি। ফলন ভালো হওয়ায় এ জাতের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।‘
অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মো. মহাসিন বলেন, ‘বিভিন্ন ফলদ গাছের পাশাপাশি গ্র্যান্ড নাইন কলার সফলতার কথা জেনে আমি আমার চার একর জমির একটি অংশ এই কলা চাষের জন্য প্রস্তুত করছি।’
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, ‘গ্র্যান্ড নাইন (জি-নাইন) জাতের কলা বাগেরহাটে একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের কলার চাষ করছেন এবং প্রতি বছর এর আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে।’
তিনি বলেন, প্রচলিত জাতের কলার তুলনায় গ্র্যান্ড নাইন কলার ফলন অনেক বেশি। যেখানে সাধারণ একটি কাঁদিতে ৮০ থেকে ১৪০টি কলা পাওয়া যায়, সেখানে গ্র্যান্ড নাইন জাতের একটি কাঁদিতে ২২০ থেকে ২৮০টি পর্যন্ত কলা উৎপাদন সম্ভব। এ জাতের কলা কম সময়ে ফলন দেয়, রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং বাজারে এর চাহিদাও ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে বাগেরহাটে গ্র্যান্ড নাইন কলার উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এ কলা সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এ জাতের কলা জেলার কৃষকদের জন্য লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কৃষিখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।