প্রকাশিত : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ৫:৪৪:৪৯
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার ছয় বছর পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। নতুন করে অন্তত ২০টি দস্যুবাহিনীর তৎপরতায় অশান্ত হয়ে উঠেছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট খ্যাত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। পুরনো আত্মসমর্পণকারী দস্যু ও নতুনভাবে সংগঠিত দল মিলেই এই বাহিনীগুলোর গঠন। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ নানা অপরাধে আবারও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এসব দস্যুবাহিনী।
জেলে ও বনজীবীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর উপকূলজুড়ে বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে দস্যুদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যুবাহিনীর ৩২৮ সদস্য বিপুল অস্ত্রসহ র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। দীর্ঘ ছয় বছর শান্তিপূর্ণ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করে। ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে দস্যুরা।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পর তারা কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হন। অনেকেই ব্যবসা শুরু করেও চাঁদাবাজির শিকার হন। ‘সাবেক দস্যু’ পরিচয়ের কারণে সামাজিকভাবে হেয় হন। বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অপরাধেও তাদের জড়ানো হয়। হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই অনেকেই আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন বলে দাবি করেন জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ, দাদা ভাই বাহিনীর জয়নাল আবেদীন ও মানজুর বাহিনীর মানজুর সরদার।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সক্রিয় বাহিনীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—জাহাঙ্গীর বাহিনী, মানজুর বাহিনী, দাদা ভাই বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাই ভাই বাহিনী, রাঙা বাহিনী, সুমন বাহিনী, আনারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আলিফ বাহিনীসহ আরও ছোট–বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি বাহিনী।
প্রতিটি বাহিনীতে ১৫–৪০ জন সদস্য রয়েছে ও তাদের হাতে দেশি-বিদেশি বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র। বনের মরাভোলা, আলীবান্দা, ধনচেবাড়িয়া, দুধমুখী, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, তেঁতুলবাড়িয়া, টিয়ারচর, পশুর, আন্দারমানিক, শিবসা–এসব এলাকায় রয়েছে তাদের আস্তানা।
গত এক বছরে তিন শতাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। কেবল সেপ্টেম্বরের পর এক মাসে শতাধিক জেলে জিম্মি হন। নৌকা প্রতি ২০–৩০ হাজার টাকা এবং অপহৃত জেলেকে মুক্ত করতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বনসংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনো দস্যুদের গডফাদার হিসেবে সক্রিয়। জিম্মি জেলেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করেন তারা। দস্যুদের দেওয়া টোকেন নৌকায় রাখলে নিরাপদে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হয়।
জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানান, দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা নিরাপদ নয়। কারণ আড়ত ও জেলেপল্লীর আশপাশে দস্যুদের সোর্সরা সক্রিয় থাকে। তথ্য ফাঁস হলে বনে গেলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ে। অনেকেই এখন আর বনে যেতে সাহস পান না।
সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দস্যুরা শুধু মানুষ নয়, বন ও জীব বৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি। তারা বাঘ ও হরিণ শিকার করে তার মাংস, চামড়া, কঙ্কাল পাচার করছে। বন কাঠও কেটে পাচার হচ্ছে। দস্যু ও গডফাদারদের দমন ছাড়া সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে গেলেও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
গত এক বছরে ২৭টি সফল অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৪ দস্যু। উদ্ধার করা হয়েছে ৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭০ রাউন্ড তাজা গুলি, শতাধিক দেশীয় অস্ত্রসহ নানা সরঞ্জাম। এছাড়া জিম্মি থাকা ৪৮ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে। দস্যুদের অবস্থান শনাক্তে কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত অভিযান শিগগিরই জোরদার হবে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অবিলম্বে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কঠোর অভিযান প্রয়োজন।