জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার পেট্রোল পাম্প থেকে উত্তর–দক্ষিণমুখী কুমড়াপুল ব্রিজ পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার সড়ক। রাত নামলেই এ সড়ক পরিণত হয় এক আতঙ্কের করিডোরে। রাত ৯টার পর এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কার্যত স্থানীয় প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকে না। নেই পর্যাপ্ত সড়কবাতি, নিয়মিত পুলিশের টহল কিংবা কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে স্থানীয়রাও রাতে একা চলাচল করতে ভয় পায়।
স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সড়কটিতে চুরি, ছিনতাই ও পথরোধকারী অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই দুষ্কৃতকারীরা রাস্তায় দড়ি টেনে যানবাহন আটকিয়ে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালামাল ছিনিয়ে নেয়। একাধিক ঘটনায় অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল আরোহীদের বেঁধে রেখে লুটপাট হয়েছে।
গত সেপ্টম্বর মাসে ভ্যান চালক আজিজুল কাঁচামালসহ বাজারে আসার সময় ওই স্থানে ডাকাতি হয়। আরেক ভ্যান চালক মামুন বলেন, ‘আমরা রাতে ভ্যান নিয়ে আক্কেলপুর যেতে পারি না।’ তিনি অভিযোগ করেন, রাতে নিয়মিত ও কার্যকর পুলিশ টহল না থাকায় অপরাধীদের সাহস দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদিও মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন টহল দেখা যায়, তবে তা আনুষ্ঠানিক ও পরিকল্পনাহীন হওয়ায় অপরাধ দমনে কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে না। রাত নামলেই এই সড়ক যেন অপরাধীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ওই রাস্তা দিয়ে পাশবর্তী উপজেলা বদলগাছীর খাদাইল, মিঠাপুর, সাগরপুরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ চলাফেরা করে।
এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু একটি সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ধীরে ধীরে আশপাশের এলাকাতেও এর বিস্তার ঘটছে। উদ্বেগজনকভাবে একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে কানুপুর থেকে আক্কেলপুর পাম্প পর্যন্ত সড়ক ও নারিকেল বাড়ী থেকে উপজেলার কেসের মোড় হয়ে রেলগেট পর্যন্ত অংশেও। পাম্প থেকে ৮০০ মিটার দূরে আক্কেলপুর-গোবরচাপা মূল সড়কের ডান পাশের রোড নারিকেল বাড়ির রাস্তা শুরু, ১৫০ মিটার পর পূর্ব-পশ্চিম দিকে রাস্তার বাঁকে বাঁকে বেশ কয়েকটি গর্ত থাকায় জরুরি কারণ বা বিপদে যদি কেউ দ্রুত যেতে চায়, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে কেউ সহজে যানবাহন নিয়ে যেতে পারে না। এই রাস্তাতেও পর্যাপ্ত কোনো সড়কবাতি নেই, ফলে রাত নামলেই পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
রেলস্টেশনে ঢাকা বা রাজশাহীগামী ট্রেন ধরার জন্য যাত্রীরা রাত ৯টার আগেই পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে ট্রেনের সময় রাত ১১ টা থেকে ২টা পর্যন্ত। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা অনিরাপদ পরিবেশে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি নিছক ভোগান্তি নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক নিরাপত্তা সংকট।
এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাতের বেলায় ভ্যানচালক ও বিভিন্ন যানবাহন চালকরা এসব সড়কে যেতে ভয় পান। ফলে গুরুতর রোগীদের পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। আবার এ সুযোগে কিছু পরিবহনচালক ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার রোগী পরিবহনে ও ঢাকাগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, যেখানে দিনের ভাড়া মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু ভাড়া অনিয়ম নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আক্কেলপুর থানার ওসি শাহিন রেজা বলেন, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় এবং এসংক্রান্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ এখনো থানায় দায়ের হয়নি। ওই এলাকায় নিয়মিত কোনো টহল ব্যবস্থা নেই। সাধারণত বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে পুলিশ যায়। তবে সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে ওই এলাকায় রাতের টহল বাড়ানো হবে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক ফারজানা জান্নাত বলেন, জনসাধারণের নিরাপত্তা ও চলাচলের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট রাস্তায় সড়কবাতি স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে ওই এলাকার সড়কব্যবস্থা আরও নিরাপদ ও কার্যকর হয়।