আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের অনিশ্চয়তা, জাতীয় পার্টি মনোনিত সাবেক ২ বারের সংসদ সদস্য ও একাধিক ছোট দলের অংশগ্রহণে এই আসন বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সরাইলের ৯ টি, আশুগঞ্জের ৮ টি ও বিজয়নগরের ২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
জানা যায়, ১৯৮৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপনির্বাচন মিলিয়ে সর্বাধিক ৪ বার জয় লাভ করেছে বিএনপি। জাতীয় পার্টি ৩ বার, ইসলামী ঐক্যজোট ১ বার এবং ১ বার আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এ ছাড়া ২ বার স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে এবার এই আসনে সবচেয়ে ভাবনায় আছে বিএনপি। এখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিব। এবং বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন ও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিতও দিচ্ছেন না তিনি।
এ ছাড়া আরও এক বিএনপি বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী তরুণ দে এখনও মাঠে সক্রিয় থাকায় এই আসনে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হবে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এই আসনের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য হলেও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। নিয়মিত জনসভা ও উঠান বৈঠকে তিনি জানান, এটি কোনো দলের লড়াই নয়, বরং অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনগণের ভোটের লড়াই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার স্বতন্ত্র অবস্থান বিএনপি-সমর্থিত ভোটে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
সাম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত এক মিলাদ মাহফিলে রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও নেতিবাচক মন্তব্য করায় আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ও একই উপজেলার যুবদলের আহ্বায়ক আলমগীর খাঁর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহান বরাবর অভিযোগ করেন তিনি।
এক বক্তব্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা জোটের মনোনীত প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ বলে মন্তব্য করেন। প্রতিউত্তরে জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, আমার বাড়ি বার্মা বা আরাকানে নয়, আমার বাড়ি বাংলাদেশেই, অষ্টগ্রামে। জোটের নেতা তারেক রহমান আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ইনশাআল্লাহ, সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ আমার পাশে আছেন। নির্বাচনে জয়ী হতে আশাবাদী থাকলেও আমাকে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পাশাপাশি আমার বিরুদ্ধে অনেক বাজে মন্তব্যও করা হচ্ছে।
তিনি জানান, নির্বাচিত হলে এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও খেলার মাঠের উন্নয়নের ওপর তিনি বিশেষ নজর দেবেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই আসনটি জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জোট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। ইতিমধ্যেই তিনি চষে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি ইউনিয়ন। তিনি মাঠপর্যায়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন ও জোটের ঐক্যবদ্ধ ভোটই তার প্রধান শক্তি বলে দাবি করছেন। সবার কাছে বলছেন আমার খেজুর গাছটাকে আপনারা ধানের শীষ বানিয়ে দেন।
তিনি বলেন, সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ আমাকে আপ্রাণ ভালোবাসা দিচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল দিতে পারব। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঐক্যের মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হবে। ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকি, তাহলে সামনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সরাইল-আশুগঞ্জে খেজুর গাছ মার্কাই ধানের শীষ।
একই সঙ্গে এই আসনে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোবারক হোসেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, সংগঠিত কর্মীবাহিনী ও নিয়মিত মাঠে থাকার কারণে জামায়াতও গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে পারবে।
নির্বাচনে জামায়াতের জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করলে জামায়াতে ইসলামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার আমীর মোবারক হোসেন বলেন, জোট থেকে এখনো কোনো চুড়ান্ত ঘোষণা হয়নি। তা হলে আপনারা সময়মতো জানবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগ পর্যন্ত আমি আশাবাদী। আমি দেড় বছর ধরে মাঠে কাজ করছি। ইনশাআল্লাহ, যদি মনোনয়ন পাই, বিজয়ী হবো।
এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী এডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ এবং ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। দুইবার নির্বাচিত হয়ে তিনি এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পুরোনো ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে তিনি আবারও সংসদে যাওয়ার আশায় মাঠে নেমেছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির মনোনিত প্রার্থী এডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা জানান, পূর্বেও দুইবার আমি এই আসন থেকে জয় লাভ করেছি। সরাইল আশুগঞ্জের মানুষের প্রতি আমার আস্থা এবারও তারা আমাকেই নির্বাচিত করবেন।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে প্রার্থী হয়েছেন আশরাফ মাহাদী। নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে তিনি তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এ ছাড়া এই আসন থেকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এস.এন. তরুণ দে, ইসলামী আন্দোলন থেকে নেছার আহমদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল থেকে তৈমুর রেজা মো. শাহজাদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে মো. মাঈন উদ্দীন, খেলাফত মজলিস থেকে আবুল ফাত্তাহ মো. মাসুক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এবারের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ হবে ভোটারদের মনোভাব, প্রার্থীদের জনসংযোগ কৌশল, স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মনোযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণার কার্যকারিতার সমন্বয়ে। তাই এ আসনকে শুধু ভোটের লড়াই হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার পরীক্ষার মঞ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা ও প্রার্থীর শক্তি অনুযায়ী ফলাফল আশানুরুপ নাও হতে পারে, যা ভবিষ্যতে এলাকার রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রভাব ফেলবে। প্রার্থীদের কঠোর প্রচেষ্টা, ভোটারদের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রেকর্ড থাকবে।