সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আশা ভোঁসলে। যার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কখনো ‘দম মারো দম’-এর মাদকতা, কখনো ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র চঞ্চলতা, আবার কখনো ‘ইন আঁখো কি মস্তি’-এর ধ্রুপদী আবেদন, সবখানেই তিনি অনন্য। তবে এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর অনেক অজানা গল্প।
দশ বছর বয়সেই কাঁধে সংসারের ভার
আশা ভোঁসলের জীবনের শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাজহা বাল’-এর মাধ্যমে তার প্রথম গান রেকর্ড করা হয়। সেই যে শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
গিনেস বুক ও বিশ্বরেকর্ড
২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস আশা ভোঁসলেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৪৭ সাল থেকে হিসাব করলে ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন তিনি। এই বিশাল সংখ্যা আজও বিশ্বের যেকোনো সঙ্গীতশিল্পীর কাছে এক বড় মাইলফলক।
আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও গ্র্যামি মনোনয়ন
ভারতীয় গায়িকাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে সফল হওয়ার নজির আশার ঝুলিতেই প্রথম জমা হয়। ১৯৯৭ সালে ‘লিগ্যাসি’ ও ২০০৬ সালে ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট’—এই দুটি অ্যালবাম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ফাস্ট বোলার ব্রেট লি-র সঙ্গেও গলা মিলিয়েছেন তিনি, যা সেই সময় আন্তর্জাতিক মহলে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।
রান্নার নেশা থেকে রেস্তোরাঁ চেইন
সঙ্গীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও অগাধ টান ছিল আশার। সেই ভালবাসাকেই তিনি পেশায় রূপ দিয়েছেন। দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন এমনকি ব্রিটেনের বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের মতো শহরেও রমরমিয়ে চলছে তার রেস্তোরাঁ ‘আশা’স’ (Asha's)। উত্তর ভারতীয় খাবারের ঘরোয়া স্বাদ দিয়ে তিনি জয় করেছেন ভোজনরসিকদের মন।
পদ্মবিভূষণ ও সর্বোচ্চ সম্মান
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০০ সালে ভারত সরকার তাকে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৮ সালে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ লাভ করেন। দিল্লির মাদাম তুসো মিউজিয়ামে মাইকেল জ্যাকসনের মতো তারকার পাশেই স্থান পেয়েছে তার মোমের মূর্তি।
আশা ভোঁসলে শুধু একজন গায়িকা নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তার অদম্য প্রাণশক্তি ও কণ্ঠের বৈচিত্র্য বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে তাকে এক অপরিহার্য ও চিরস্মরণীয় নাম হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।