খাবারের স্বাদ আপনি কীভাবে বুঝবেন? স্বাদ বোঝার জন্য জিভে লবণ লাগে। আশা ভোঁসলের কণ্ঠও ঠিক তেমন, লবণের মতো। পেশাদারিত্ব বা যোগ্যতায় তার সমকক্ষ কেউ নেই বলাটা একপ্রকার ধ্রুব সত্য।
ভালোবাসার প্রতিটি পর্যায়ের জন্য আশা ভোঁসলের একটি করে গান রয়েছে।
আকর্ষণ: আইয়ে মেহেরবান (হাওড়া ব্রিজ)
মোহ: চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো (ইয়াদো কী বারাত)
আসক্তি: আভি না যাও ছোড় কার (হাম দোনো)
বিশ্বাস: ইয়ে ওয়াদা রাহা (ইয়ে ওয়াদা রাহা)
আরাধনা: ইন আখো কি মাস্তি (উমরাও জান)
উন্মাদনা: পিয়া তু আব তো আ জা (কারাভান)
বিসর্জন/মৃত্যু: মেরা কুছ সামান (ইজাজাত)
চঞ্চল, সাহসী, আবেদনময়ী, কৌতুকপূর্ণ, ভুতুড়ে, শোকাতুর কিংবা আত্মিক— আশা ভোঁসলে তার কণ্ঠকে সম্ভাব্য সব উপায়ে ঢেলে সাজাতে পারতেন। সর্বদা অপ্রচলিত পথে হাঁটতে পছন্দ করা এই শিল্পী সব চরিত্রে হয়ে উঠতে পারতেন অনন্য।
২০২৫ সালে তার প্রথম পডকাস্ট কাপল অব থিংস-এ তিনি বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র জগতে আমার ৮২ বছর হয়ে গেল। আমার ইচ্ছে, গাইতে গাইতেই যেন আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। এভাবে চলে যেতে পারলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবো।’
রোববার (১২ এপ্রিল) সেই কণ্ঠস্বর, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সঙ্গীতপ্রেমীদের বিনোদিত করেছে, তা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।
আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে প্রখ্যাত গায়ক দীননাথ মঙ্গেশকর এবং শেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এই দম্পতির তৃতীয় সন্তান ছিলেন। সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর ও মীনা খাড়িকরের ছোট এবং ঊষা মঙ্গেশকর ও হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের বড়।
আশার বয়স যখন মাত্র নয় বছর, তখন তাদের বাবার মৃত্যু হয়। এরপর তাকে এবং লতা মঙ্গেশকরকে জীবিকার সন্ধানে কাজে নামতে হয়।
১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি 'মাঝা বাল'-এর 'চালা চালা নাভ বালা' গানের মাধ্যমে ১০ বছর বয়সে গান গাওয়া শুরু করেন আশা। চলচ্চিত্র জগতে নিজের জায়গা করে নিতে শুরুতে তাকে বেশ লড়াই করতে হয়, বিশেষ করে যখন নায়িকাদের নেপথ্য কণ্ঠ (প্লেব্যাক) দেওয়ার জন্য লতা মঙ্গেশকরই ছিলেন প্রথম পছন্দ।
লতা মঙ্গেশকর যা ছিলেন না, আশা ছিলেন ঠিক তার বিপরীত। লতা মঙ্গেশকর যেখানে হয়ে উঠেছিলেন শুদ্ধ ও নীতিবান নায়িকার কণ্ঠস্বর, সেখানে আশা ভোঁসলে নতুন পথ তৈরি করেন ক্লাবে ক্যাবারে পরিবেশনকারী আকর্ষণীয় ও চতুর নারী কিংবা ‘আইটেম গার্ল’-দের জন্য প্রাণবন্ত নাচের গান গেয়ে।
আশা না থাকলে হেলেন হয়তো কখনোই কোনো কণ্ঠ পেতেন না। 'ও হাসিনা জুলফনওয়ালি', 'আ জানে জান' থেকে শুরু করে 'ইয়ে মেরা দিল'—আশার প্রাণশক্তি ও আবেগ ছাড়া হেলেনের সেই আবেদনময়ী নাচের মুদ্রাগুলো কল্পনা করা অসম্ভব। বিনোদন জগতে নিজের আলাদা স্থান তৈরি করতে তাকে যে অনন্য কিছু করতে হবে, তা তিনি জানতেন।
তিনি যদি আপনাকে 'জাওয়ানি জানেমান' এবং 'দম মারো দম'-এর তালে নাচাতে পারেন, তাহলে 'যাউ কাহা যাউ' এবং 'ইয়ে কেয়া জাগান হ্যায় দোস্তো' দিয়ে প্রিয়জনের অভাবও অনুভব করাতে পারেন।
'চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো', 'পিয়া তু আব তো আজা', 'আভি না যাও ছোড় কার', 'ইন আখো কী মাস্তি' থেকে 'এক ম্যায় অর এক তু'—শুধু প্রেমের গানের ক্ষেত্রে তিনি যে বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন, তা ছিল বিস্ময়কর।
আশা একবার বলেছিলেন, ‘আমি ভাবতাম, দিদি যতদিন এই পেশায় আছেন, আমি যদি তার মতো একই স্বরে গেয়ে যাই, তাহলে কাজ পাব না। আমার নিজের কোনো নাম বা খ্যাতি হবে না। এই উপলব্ধির পর আমি গান গাওয়ার ধরন বদলাতে শুরু করি। আমি ইংরেজি সিনেমা দেখতে শুরু করি, যাতে পশ্চিমা গানগুলো শিখতে পারি। তারা কীভাবে ইংরেজিতে গায়, তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। এছাড়া আমি কাওয়ালি, গজল এবং বিভিন্ন ধরনের গানে কণ্ঠের মোচড় শিখতে শুরু করি।’
দুই বোনের মধ্যে রেষারেষি নিয়ে অনেক তুলনা ও গুঞ্জন থাকলেও তারা কেউই তা স্বীকার করেননি।
আশা বলেছিলেন, ‘মানুষ অনেক কথা ছড়াত এবং ঝামেলা তৈরির চেষ্টা করত। কিন্তু রক্তের টান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মনে আছে, কখনো কখনো আমরা দুজনেই কোনো অনুষ্ঠানে থাকতাম এবং ইন্ডাস্ট্রির কিছু লোক নিজেদের আনুগত্য প্রমাণ করতে আমাকে উপেক্ষা করে শুধু দিদির সঙ্গেই কথা বলত। পরে দিদি এবং আমি এটা নিয়ে হাসাহাসি করতাম।’
গুঞ্জন আছে, ১৯৯৮ সালে নির্মিত ‘সাজ’ চলচ্চিত্র লতা ও আশার পেশাগত জীবনের দ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। যদিও সে দাবি উড়িয়ে দিয়েছিলেন আশা।
‘এটা একেবারেই সত্য নয়। দুই নারীকে নিয়ে কয়েকটি ঘটনা বাড়িয়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা বানানো সময়ের অপচয়,’ বলেন তিনি।
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করেন। শুরুতে তাকে কেবল ‘নাচের গানের কণ্ঠ’ হিসেবে গণ্য করা হলেও চ্যালেঞ্জ নিতে এবং মানুষের ধারণা ভুল প্রমাণ করতে ভালোবাসতেন আশা।
মুম্বাইয়ের দীননাথ মঙ্গেশকর নাট্যমন্দির হলে লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণের কয়েক বছর পর তার ছবি উন্মোচন অনুষ্ঠানে দিদির কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন আশা।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “তিনি (লতা) বলতেন, ‘তুমি এখানে আসো বা না আসো, আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সঙ্গে আছে। মাই, বাবা এবং আমি সবসময় তোমার জন্য আছি।' এখন তার চলে যাওয়ার পর কার কাছে আশীর্বাদ চাইব? কাকে আমার সমস্যার কথা বলব? আমরা সবাই অনাথ হয়ে গেলাম। আমাদের পথ দেখানোর জন্য তার অন্তত আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকা উচিত ছিল।”
সঙ্গীত ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে ২০১১ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো এই গায়িকা বলেছিলেন, ‘কেউই নিখুঁত নয়। সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলানো যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি নায়িকার জন্য গেয়েছি, নৃত্যশিল্পীর জন্যও গেয়েছি। আমি সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতাম। তবে ইচ্ছে ছিল, আরও বেশি ভাষায় গান গাওয়ার, আরও বেশি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত করার।’
ও পি নায়ার, এস ডি বর্মন, আর ডি বর্মন (যাকে তিনি পরবর্তীতে বিয়ে করেন), বাপ্পি লাহিড়ী এবং এ আর রহমানের মতো সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে জুটি গড়ে তুলেছিলেন ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গাওয়া আশা।
ভাগ্যে বিশ্বাসী এই শিল্পী ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘রাজনীতির’ শিকার হওয়া নিয়েও সরব ছিলেন।
তার ৯০তম জন্মদিনে দুবাইয়ে কনসার্টের আগে পিটিআইকে বলেছিলেন, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনীতি আছে। চলচ্চিত্রেও আছে। তাই এটি সহজ নয়। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি। যা আমার জন্য নির্ধারিত, তা আমি পাবই। আর যা নয়, তা কখনো পাব না। আমি অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু এখন পেছনে তাকালে সবই মজার মনে হয়। কারণ আমি সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।’
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি