রাজ্জাক, আলমগীর, বুলবুল আহমেদের উত্তরসূরীদের ব্যর্থতাই কি দায়ী?
একুশ শতকের আগে ছিলনা সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ডিজিটাল প্রচারনার ব্যবস্থা। রাস্তার ধারে টানানো থাকত পোষ্টার। মাঝে মধ্যে মাইকে একজন ঘোষক প্রচার করতেন, কবে কোথায় কোন সিনেমার শুভমুক্তি।
অনেক সময় কোনো প্রচারনা ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তি পেত। কয়েক বছর আগেও গ্রামীন সমাজে বিশেষ করে অতিথিকে বিনোদিত করার মাধ্যম ছিল সিনেমা।
ছুটির দিনে কিংবা অবসরে পরিবারের সদস্যরাও ছুটে যেতেন রাজ্জাক, আলমগীর, শাবানা, ববিতা, বুলবুল আহমেদ, সালমান শাহ, শাবনূর, মৌসুমী , শাবনাজ, নাঈমদের অভিনীত সিনেমা দেখার জন্য।
দিনের প্রথম প্রদর্শনীতে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে স্কুল ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীরাও হাজির হতেন প্রায় নিয়মিত।
এসব ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায় বাংলাদেশের সিনেমাশিল্প কতটা জীবনঘনিষ্ঠ ছিল।
কিন্তু একুশ শতকের শুরুর পর থেকে সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ কমতে শুরু করে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিনেমা থেকে ধারাবাহিকভাবে দর্শক বিচ্ছিন্নতার অন্যতম একটি কারণ হলো তারকা শিল্পীর উপস্থিতি কমে যাওয়া।
বলা যায় এক শাকিব খান ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্র শিল্পীর মধ্যেই ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
অথচ রাজ্জাক, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, শাবানা, ববিতা, সুচন্দাদের পর তাদেরই একঝাঁক উত্তরসুরী চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন।
এর মধ্যে অনেকেই নাম কুড়ান শুরুতেই।
নায়করাজ রাজ্জাকের দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট চলচ্চিত্রে দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয় করে পরিচিতি তৈরী করেছিলেন। কিন্তু এখন তারা চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
আলমগীরের সন্তানদের মধ্যে একমাত্র আঁখি আলমগীর মিডিয়ায় কাজ করেন। ছোট বেলায় অভিনয়ে দেখা গেলেও বড় হয়ে গানের জগত বেছে নিয়েছেন।
চিত্রনায়ক বুলবুল আহমেদের একমাত্র কন্যা ঐন্দ্রিলা কয়েক বছর আগেও অভিনয়ে সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। এখন একেবারেই উদাসীন অভিনয়ে।
প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক কাজী হায়াতের ছেলে কাজী মারুফ ঢালিউডে অভিষেকের পর থেকেই অভিনয়ে দারুণ সম্ভাবনা তৈরী করেছিলেন। তার অভিনীত বেশ কয়েকটি সিনেমা আলোচনাতেও এসেছিল। কিন্তু তিনি সব ছেড়ে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন।
বর্ষীয়ান অভিনেতা আবুল হায়াত এখনও নাটক-সিনেমায় সমানতালে অভিনয় করে যাচ্ছেন কিন্তু তার মেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত অভিনয় থেকে দুরে সরে গেছেন। তিনিও আমেরিকা প্রবাসী কয়েক বছর ধরে।
লাকী ইনাম ও ইনামুল হক দম্পত্তির কন্যা হৃদি হকও অভিনয় পরিচালনায় নাম কামিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও ইদানীং বিনোদন মিডিয়া থেকে দুরে সরে আছেন।
কালজয়ী অভিনেত্রী ববিতার একমাত্র ছেলের মিডিয়ার সাথে কোনো সংশ্লিষ্ঠতা না থাকলেও সুচন্দার একমাত্র ছেলে তপু রায়হানের সিনেমায় অভিনয়ে অভিষেক হয়েছিল কমপক্ষে দুই যুগ আগে। তিনিও বাবা জহির রায়হান ও মা সুচন্দার মতো চলচ্চিত্রপ্রেমী হন নাই।
অথচ রাজ্জাক, আলমগীর, সুচন্দাদের মতো সিনিয়রদের পরবর্তী প্রজন্ম কিংবা উত্তরসুরীরা তাদের অভিভাকদের সাহচার্যে যেভাবে শুরু করেছিলেন চলচ্চিত্র যাত্রা। তা চলমান রাখলে হয়তো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন এতো দুর্দশায় পতিত হতো না।
পাশের দেশ ভারতে উল্টো চিত্র। যে কারণে বলিউডও সমৃদ্ধ। সেখানে ধর্মেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চন, শর্মিলা ঠাকুর, ঋষি কাপুর, মহেশ ভাট, অনিল কাপুর , সাইফ আলী খানদের উত্তরসুরীরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিবেদিত হয়ে চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। যার কারণে বলিউডে তারকা সঙ্কটও ঘটছেনা, পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগও নেই।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে তারকা শিল্পীদের ধরে রাখা কিংবা দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করার বিষয়টি আরও জোড়ালো হয়ে উঠছে।
তা না হলে চলচ্চিত্র শিল্প টিকে থাকবে শুধু মাত্র হিসাবের খাতায়।