‘এক্সটরশন’ বা ‘চাঁদাবাজি’ শব্দ কানে আসা মাত্রই এক ধরনের জোরজবরদস্তি ও অন্যায্য দাবির ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এটি কেবল অর্থ বা সুবিধা দাবি করা নয়; বরং এর সঙ্গে মিশে আছে বলপ্রয়োগ ও অনৈতিকতার এক রূঢ় বাস্তবতা।
ইতিহাসের পরতে পরতে তাকালে দেখা যায়, এই শব্দ ক্ষমতা প্রদর্শন আর শোষণের বিরুদ্ধে মানবসমাজের চিরন্তন উদ্বেগেরই এক প্রতিচ্ছবি। চাঁদাবাজির উৎস সন্ধানের অর্থ কেবল এর ভাষাগত বিবর্তন জানা নয়; বরং সময়ের আবর্তে আইন, নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের যে জটিল রূপান্তর ঘটেছে, তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা।
চাঁদাবাজির ইতিহাস অনুসন্ধান
এক্সটরশন শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘এক্সটরশিও’ থেকে, যা মূলত ‘এক্সটরকোয়েরে’ ক্রিয়াপদ থেকে উদ্ভূত। এর আক্ষরিক অর্থ হলো—নিংড়ে বের করা বা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া।
এই ক্রিয়াপদ আবার দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত—‘এক্স’, যার অর্থ ‘বাইরে’ এবং ‘টরকোয়েরে’, যার অর্থ ‘নিংড়ানো’। শুরুর দিকে এই শব্দ মূলত হুমকি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো কিছু—সাধারণত অর্থ বা সম্পত্তি—জোরপূর্বক আদায় করাকে বোঝাত।
চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে এক্সটরশন শব্দটি মিডল ইংলিশে (ইংরেজি ভাষার ঐতিহাসিক পর্যায়, যা আনুমানিক ১১৫০ থেকে ১৫০০ সাল পর্যন্ত প্রচলিত) প্রবেশ করে এবং অন্যায্য বলপ্রয়োগের সঙ্গে এর দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার আইনি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিস্তৃত হয়; যা ভয়ভীতি প্রদর্শন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ বা অনৈতিকভাবে সম্পদ অর্জনকে সংজ্ঞায়িত করে।
চাঁদাবাজির সাংস্কৃতিক যাত্রা
ইতিহাসজুড়ে সাহিত্য, আইন এবং সংবাদমাধ্যমে এক্সটরশন বা চাঁদাবাজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধ্রুপদী সাহিত্যে প্রায়ই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হতে দেখা যায়; যা শোষণ বনাম ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে আরও জোরালো করে।
সংগঠিত অপরাধের আলোচনায়ও এই শব্দ বারবার আসে; যেখানে ক্ষমতা দখল এবং আর্থিক লাভের জন্য চাঁদাবাজিকে একটি সাধারণ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আজকাল সিনেমা বা নাটকে আমরা প্রায়ই দেখি, কীভাবে প্রভাবশালীরা বা মাফিয়ারা ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থেকে শুরু করে মাফিয়াদের অন্ধকার জগত—সবখানেই চাঁদাবাজির এসব দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত।
গল্প বলার ক্ষেত্রে এই শব্দের নিরন্তর উপস্থিতি নৈতিকতা, ক্ষমতা এবং দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে এর গভীর সংযোগকে স্পষ্ট করে।
বর্তমান যুগে চাঁদাবাজির প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান সময়েও চাঁদাবাজি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি শব্দ; বিশেষ করে আইনি, আর্থিক এবং রাজনৈতিক আলোচনায়। অনেক বিচারব্যবস্থায় এটি দণ্ডনীয় অপরাধ; যেখানে শোষণ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য কঠোর আইন রয়েছে।
ডিজিটাল যুগ চাঁদাবাজির নতুন রূপের সূচনা করেছে। যেমন—সাইবার এক্সটরশন। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা সংবেদনশীল তথ্য ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে মুক্তিপণ দাবি করে।
চাঁদাবাজির এই চলমান বিবর্তন প্রমাণ করে, পরিবর্তনশীল সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে তাল মেলাতে ভাষাও কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয়।
চাঁদাবাজি বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
চাঁদাবাজির উৎস ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের মধ্যে চলে আসা এক চিরন্তন সংগ্রামের দিকে ইঙ্গিত করে। এর ভাষাগত এবং ঐতিহাসিক বিবর্তন বোঝা আইনি ও নৈতিক সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।
সমাজ যেহেতু আজও জোরজবরদস্তি এবং শোষণের মতো বিষয়গুলো মোকাবিলা করছে, তাই আইনি আলোচনা এবং দৈনন্দিন ভাষায় চাঁদাবাজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হিসেবে টিকে আছে।
তথ্যসূত্র: ওয়ার্ডপান্ডিত