বারবার নির্মাণকাজের সময় বাড়িয়েও এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’-এর জন্য কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ায় প্রকল্পটি এখন উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে বলে জানানো হচ্ছে।
সরকার বলছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, চলতি মাসের শেষেই প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকতে পারেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাজ শুরু হবে। বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পরই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে ছয় থেকে বারো মাস সময় লাগতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে শুরুর পর প্ল্যান্টটি বন্ধও করা হতে পারে, কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদন একবার শুরু করার পর আর থামবে না। দেড় বছরের সাইকেলে টানা চলতে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করা হয়, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আবারও পর্যালোচনা করে। ‘এটা একটা পাইলট অপারেশন…এই সময়ে সিনক্রোনাইজেশন, টারবাইন-জেনারেটর ও জরুরি সাপোর্ট সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা যাচাই করা হয়।’
প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিনের এই সংবেদনশীল প্রক্রিয়ার পর বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে আরও অনুমোদন প্রয়োজন হয়। শফিকুল ইসলাম জানান, পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে রিঅ্যাক্টর ৯০ শতাংশ সক্ষমতায় ১৮ মাস টানা চলবে, এরপর জ্বালানি প্রতিস্থাপনসহ রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় কাজ করবে, যেখানে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং তা দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের নিরাপত্তা নিয়ে কোনোভাবেই আপসের সুযোগ নেই।
সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনা মেনেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ‘নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়েছে’ বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে রূপপুর প্রকল্পকে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হলেও অতীতে একাধিকবার সময় পিছিয়ে যাওয়ায় এখনো সংশয় কাটেনি। রাশিয়ার সহায়তায় ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় ইতোমধ্যে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলট অপারেশন শুরু হলে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে এবং গ্রিড সক্ষমতাও বড় বিষয় হয়ে থাকবে।
এদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন ইতোমধ্যে প্রস্তুত। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ইউনিট ওয়ানের জন্য আমাদের চারটি লাইন প্রস্তুত রয়েছে…৩০ মের মধ্যেই কাজ শেষ হয়েছে।’ দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলেও জানান তিনি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ‘ফুয়েল লোডিং’-এর কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ায় প্রকল্পটি এখন উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধাপ শেষ হলেও বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে আরও সময় লাগবে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার যে লক্ষ্য সরকার জানিয়েছে, তা বাস্তবে কতটা সময়মতো পূরণ হবে—তা নির্ভর করছে চলমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর।