জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ‘লাইফটাইম টেনার ক্যাপ’ এ একমত, কিন্তু জটিলতার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো একটি সময়সীমার ধারণা আনতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো। আলোচনা হচ্ছে—প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ কত বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? গণতন্ত্র চর্চা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে চলমান সংলাপে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক বৈঠকে ‘প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা ১০ বছর বা দুই পূর্ণ মেয়াদ’ নির্ধারণের প্রস্তাবকে অধিকাংশ দল স্বাগত জানিয়েছে।
বিএনপির অবস্থান কী?
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রকাশ্যেই প্রস্তাবকে ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছে। তবে তারা চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আরও কয়েকটি কাঠামোগত বিষয় যেমন—নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা, এবং দায়বদ্ধতা এইসব বিষয়ের আলোচনার পর প্রস্তাবে একমত হতে চায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন:
“আমরা চাই গণতন্ত্রে স্থায়ীত্ব। একনাগাড়ে ক্ষমতা থাকলে কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়। তাই সময়সীমা জরুরি। তবে কেবল মেয়াদ নির্ধারণ করলেই হবে না, ক্ষমতার কাঠামোও বদলাতে হবে।”
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মূল দিকগুলো:
অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়া:
গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য-সহ বহু দল সরাসরি প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছে। অনেক দল বলছে, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান নির্বাহী পদে কোনও ব্যক্তি যেন “লাইফটাইম ক্ষমতায়” থাকতে না পারেন, সেটাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ এখনো এই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। তবে তারা অতীতে বলেছে, “জনগণ যাকে ভোট দেয়, তিনিই ক্ষমতায় যাবেন।”
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে:
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তানভীর আহমেদ মনে করেন:
“এটি বাংলাদেশের সংবিধানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে। মেয়াদসীমা থাকলে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে, নতুন চিন্তাধারা উঠে আসে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এ নিয়ম রয়েছে।”
তিনি বলেন, এটি একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে জবাবদিহিতাও বাড়াবে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ:
সকল দলের আলোচনার ভিত্তিতে যদি প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ, নেতৃত্বে রোটেশন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথ তৈরি করবে এটি। তবে প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে শুধুমাত্র মেয়াদ নির্ধারণই নয়, নির্বাচন কমিশন, সংসদ ও রাজনৈতিক সংস্কার—সবকিছু একসাথে বিবেচনায় আনতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন দলগুলোর আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।