অবৈধ অভিবাসনের শিকার হয়ে বিদেশে আটকে পড়েছিলেন কয়েক বছর, উদ্যোগে ফিরছেন স্বদেশে
ঘটনার প্রেক্ষাপট: দালালদের প্রলোভন, সীমান্তে বন্দিত্ব
ফেরত আসা ২৬ বাংলাদেশির প্রত্যেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে।
তারা কেউ ছিলেন দিনমজুর, কেউ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। দালালের মাধ্যমে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার আশায় ঘর ছেড়েছিলেন। বেশিরভাগকেই প্রথমে দুবাই বা ওমানে পাঠানো হয়, পরে সেখান থেকে স্থলপথে পাকিস্তান ও ইরানের সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢুকানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু যাত্রাপথেই তারা ধরা পড়ে যান। কেউ ইরানের পুলিশে, কেউ পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক হন। এরপর শুরু হয় বছরের পর বছর ধরে বন্দিদশা, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, এমনকি নির্যাতনও।
বন্দিজীবনের ভয়াবহতা
ইরানে আটক থাকা এক বাংলাদেশি ফোনে গণমাধ্যমকে জানান,
আমাদের ১৮ জন এক কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতাম। খাবার সীমিত, চিকিৎসা ছিল না। মাঝে মাঝে মারধরও করত। কয়েকবার আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলাম।
পাকিস্তানে আটক আরেকজন জানান, তারা দীর্ঘদিন ‘আন-ডকুমেন্টেড’ হিসেবে সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান এলাকায় কারাগার সদৃশ শিবিরে আটকে ছিলেন।
ফেরার আয়োজন: দূতাবাস ও আইওএমের সহায়তায়
বাংলাদেশের ইসলামাবাদ ও তেহরানে নিযুক্ত দূতাবাস বিষয়টি নিয়ে বিগত কয়েক মাস ধরে আইওএম-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছিল। অবশেষে গত সপ্তাহে সকল কাগজপত্র, ট্রাভেল পাস ও স্বাস্থ্যের ছাড়পত্র সম্পন্ন হলে তাদের দেশে ফেরানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। আইওএম-এর ঢাকা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “এই ধরনের অভিযানে আমরা শুধু ফিরিয়ে আনি না, ফেরত আসাদের কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনায় সহায়তা করি।” ফেরত যাত্রীরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসলামাবাদ ও তেহরান থেকে কাতার এয়ারওয়েজের মাধ্যমে ঢাকায় পৌঁছাবেন।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া: ফিরে পাওয়ার আনন্দ, না বলা ক্ষত
মাদারীপুরের এক কৃষকের ছেলে ফিরছেন পাঁচ বছর পর। তার মা বলেন, “মৃত ভেবে কান্না করেছিলাম। আজ শুনছি সে ফিরছে! এটা আল্লাহর দয়া ছাড়া কিছু না।” কিন্তু ফিরে আসা মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। ধার-দেনা করে বিদেশ গিয়েছিলেন। ফিরে পেয়ে পরিবার খুশি হলেও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি যেন কেউ পাচারকারীদের ফাঁদে না পড়ে। যারা আটকে পড়েছেন, তাদের ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।” সরকার ফেরত আসাদের জন্য পুনর্বাসন ভাতা, কাউন্সেলিং, ও ট্রেনিং সুবিধা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মানব পাচার: এখনই রোধ জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা নতুন নয়, বরং প্রতিদিন এমন শত শত তরুণ জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। কাজের খোঁজে, উন্নত জীবনের আশায় দালালের ফাঁদে পড়া এই তরুণদের গন্তব্য হয়ে উঠছে অন্ধকার, নির্যাতন আর মৃত্যু।
অভিবাসন বিশ্লেষক মাহবুবুর রহমান বলেন,
দালাল চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের শাস্তিমূলক অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ তথ্য ও নিরাপদ পদ্ধতি জানাতে হবে।