আল জাজিরার প্রতিবেদন
ঢাকার রিকশাচালক আনোয়ার পাগলার রিকশার হুডের একপাশে জাতীয় পতাকা; অন্যপাশে বিএনপির দলীয় পতাকা। তিনি এই দলের একনিষ্ঠ সমর্থক।
আনোয়ার আল জাজিরাকে বলেন, ‘সবাই আমাকে পাগল বলে, কারণ এই দলটাই আমার জীবনের সব। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমরা জিতেছি। দেশ এখন ভালো থাকবে।’
দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে দলটি। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই বিজয় আনুষ্ঠানিক পূর্ণতা পায়।
২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন। অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর; যার জেরে দেশজুড়ে বিক্ষোভে ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন এই প্রধানমন্ত্রী দেশ ছাড়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুক্রবার সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, তিনি জনগণের এই ভালোবাসায় ‘কৃতজ্ঞ’।
দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারজুড়ে তারেক রহমান দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
বৃহস্পতিবারের ভোটগ্রহণ মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল। ভোট গণনায় ‘অসংগতি ও কারচুপির’ অভিযোগ তুললেও শনিবার নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয় জামায়াত।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দুই দশক পর তার ছেলে আবার বিএনপিকে সরকারে ফিরিয়ে আনছেন।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের খবর শুনে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে উল্লাসিত জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন দলটির কর্মী কামাল হোসেন। বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি পার করে আসা দমন-পীড়নের দিনগুলোর কথা বলছিলেন।
কামাল হোসেন বলেন, ‘অনেক সময় মনে হতো, শেখ হাসিনার শাসন বোধহয় আর শেষ হবে না। কিন্তু চব্বিশের জুলাই বিপ্লব তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এখন মানুষ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা আমাদের বাংলাদেশকে ফিরে পেয়েছি।’
কামাল হোসেন মনে করেন, নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য আমাদের খুব কষ্ট দিচ্ছে। বেকার তরুণের সংখ্যাও অনেক। সরকারকে দ্রুত এসব দিকে নজর দিতে হবে।’
ভোট গ্রহণের পরদিন শুক্রবার ঢাকা শহর ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। মূলত বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো বিজয় মিছিল না করার সিদ্ধান্তের কারণেই এই নি:স্তব্ধতা।
মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও ছিল নিরুত্তাপ। সেখানে উপস্থিত কিছু সমর্থকের কণ্ঠে ছিল হতাশা।
আব্দুস সালাম নামে এক সমর্থক দাবি করেন, ভোট গণনায় ‘কারচুপি’ হয়েছে এবং ‘সংবাদমাধ্যমও’ জামায়াত জোটের ‘বিরুদ্ধে’ ছিল।
তবে জার্মান প্রবাসী জামায়াত সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহর মতে, এই হার তাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা। অনেক জায়গায় তাদের সঠিক নির্বাচনী প্রচার ও পোলিং এজেন্ট ছিল না।
বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও এই নির্বাচনে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়েছে। প্রচারের সময় কিছু বিক্ষিপ্ত সহিংসতা এবং অনলাইনে কাদা ছোড়াছুড়িও দেখা গেছে।
তবে নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর গুলশানে বিএনপি কর্মী সুজন মিয়া বলেন, ‘আমরা কোনো শত্রুতা চাই না। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশ গড়া।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, বিএনপির এই বিজয় দেশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কাকে প্রশমিত করবে।
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ রাজনীতিকে সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত করেছে। তবে আসল পরীক্ষা এখন শুরু। সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ; যা ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল।’
মার্কিন গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন।
তিনি মনে করেন, বিএনপির বিজয় ২০২৪-এর জেন-জি বিক্ষোভকারীদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের রাজনীতির জন্য ‘ধাক্কা’ হতে পারে। কারণ দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের যে অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে তরুণরা সোচ্চার ছিল, বিএনপিও সেই পুরনো ধারারই প্রতিনিধিত্ব করে।
কুগেলম্যান সতর্ক করে বলেন, নতুন সরকার যদি আবারও দমনমূলক বা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে ফিরে যায়, তবে সংস্কারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হবে।