অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করে জারি করা কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে বিরোধী দল রাজনৈতিক ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, গুম, মানবাধিকার ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়ন করা হবে।
রোববার (১২ এপ্রিল) সচিবালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপন-পরবর্তী বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সব অধ্যাদেশ নিখুঁত ছিল না। বিশেষ করে গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশে এমন কিছু বিষয় ছিল, যা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।’ তিনি নিজেও গুমের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘গুম নিয়ে অবশ্যই একটি উন্নত ও কার্যকর আইন করা হবে।’
সংসদে বিরোধী দলের একাধিক ওয়াকআউট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংসদের বিধি অনুযায়ী ওয়াকআউট করা বৈধ হলেও যেসব ইস্যুতে তারা তা করেছে, সেগুলো যৌক্তিক ছিল না। সংসদের বাইরে ভুল তথ্য দিয়ে ব্রিফিং করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি না বুঝেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিরোধীরা যেসব অধ্যাদেশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, সেগুলোই হুবহু সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পূর্বের অধ্যাদেশে কিউরেটরকে কার্যত আজীবন দায়িত্বে রাখার মতো বিধান ছিল, যা সরকার সংশোধন করেছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা করে নতুন বিল আনা যেতে পারে। যেসব বিল এখনো উত্থাপন হয়নি, সেগুলো সংশোধিত আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অধ্যাদেশগুলো ৩০ দিনের মধ্যে চারটি প্রক্রিয়ার, অনুমোদন, অননুমোদন, সংশোধন অথবা বিল আকারে উত্থাপন—মধ্যে আনতে হয়।’
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গণভোট আয়োজন করেছে। যদিও সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং এ নিয়ে আদালতে রিটও হয়েছে। গণভোট সম্পন্ন হওয়ায় এর একটি বাস্তব বৈধতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে পুনরায় গণভোট আয়োজনেও আইনি বাধা নেই।’
পরে বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি এখনো সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, কারণ সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। ৯৭টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে পাস হয়েছে, ১৩টি সংশোধন করে পাস করা হয়েছে ও সাতটি রহিতকরণ বিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু মহল সরকার এসব অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তার ভাষ্য, আইনের প্রস্তাবনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু অনেকেই তা উপেক্ষা করছেন।
তিনি জানান, ১১০টি অধ্যাদেশকে বিল আকারে সংসদে আনতে হয়েছে, যা ৯১টি বিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় ও সেগুলো পাস হয়েছে। যেসব অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল হিসেবে আনা হয়েছে, সেগুলোর প্রস্তাবনায় সংশ্লিষ্ট কারণও উল্লেখ করা হয়েছে।
গুমসংক্রান্ত আইন নিয়ে তিনি বলেন, ‘সংজ্ঞা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে মানবাধিকার কমিশন আইনের কিছু ধারায় তদন্ত, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ বিষয়ে পরামর্শসভা আয়োজন করা হতে পারে।’
আইনমন্ত্রী অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র ৫৪টি আইনে পরিণত হয়েছিল। তুলনামূলকভাবে বর্তমান সরকার অধিকসংখ্যক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করেছে। অবশিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নিয়েও সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।’