ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে ডা. তাসনিম জারার অংশগ্রহণ এবং ভোটের ফলাফল একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি জয়ী হতে পারলেন না, তার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
কাঠামোগত রাজনীতি বনাম ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা
ডা. তাসনিম জারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শিক্ষিত মহলে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে ‘ভোট ব্যাংক’ বা তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক কাঠামোর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিবের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে। হাবিবুর রশিদ হাবিব পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২১১ ভোট। বিএনপির মতো একটি সুসংগঠিত দলের প্রাতিষ্ঠানিক ভোট ব্যাংক এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা তাকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রেখেছে।
এছাড়া আমাদের দেশের সাধারণ ভোটাররা এখনো প্রার্থীর চেয়ে ‘প্রতীক’ বা ‘দলের’ প্রতি বেশি অনুগত। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে এই বিশাল দলীয় বলয় ভাঙা জারার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
প্রচারণার কৌশল: মিতব্যয়িতা বনাম প্রভাব
তাসনিম জারা আইনের মধ্যে থেকে সীমিত খরচে এবং মানুষ-ভিত্তিক যোগাযোগের ওপর জোর দিয়েছিলেন। এটি একটি আদর্শবাদী অবস্থান হলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। বড় দলগুলো ব্যানার, ফেস্টুন এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে যে ব্যাপক প্রচারণা চালায়, তার বিপরীতে সীমিত খরচের প্রচারণা অনেক ভোটারের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। এছাড়াও বড় দলগুলোর কর্মীরা যেভাবে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে সেই জনবলের অভাব বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখানে জারা ছিলেন অসহায়।
রাজনৈতিক পরিচয়ের দোলাচল
প্রথমে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে স্পষ্টভাবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা স্পষ্ট কোনো মতাদর্শিক প্ল্যাটফর্ম ছাড়া কেবল স্বতন্ত্র হিসেবে লড়া ভোটের সমীকরণে তাকে পিছিয়ে দিয়েছে।
ভোটের পরিসংখ্যান ও অবস্থান
ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় হাবিবুর রশিদ হাবিব বিএনপি থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া, এনসিপি থেকে পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট। তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। ডা. তাসনিম জারা স্বতন্ত্র (ফুটবল) প্রতীক থেকে ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পেয়ে হয়েছেন তৃতীয়।
যদিও তিনি বিজয়ী হতে পারেননি, তবুও একজন নতুন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পাওয়া একটি বড় অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরেও একটি বিশাল জনগোষ্ঠী (বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত ভোটার) বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধান করছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাসনিম জারার এই লড়াই তরুণদের পথ দেখাবে।
জারার এই লড়াই পরাজয়ের চেয়েও বড় একটি বার্তা দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পেশাদার এবং শিক্ষিত তরুণরা এখন সরাসরি রাজনীতিতে নামতে আগ্রহী। তবে কেবল জনপ্রিয়তা দিয়ে যে বড় দলগুলোর ‘অর্গানাইজড পলিটিক্স’ হারানো সম্ভব নয়, এই ফলাফল তারও একটি প্রতিফলন।