পহেলা বৈশাখ—বাংলা বছরের প্রথম দিন, নতুন আশার প্রতীক। এই শুভক্ষণকে ঘিরেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় তিনি উদ্বোধন করলেন ‘কৃষক কার্ড’। এই কর্মসূচি আপাতত একটি প্রাক-পাইলট প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। অর্থাৎ, পুরো দেশের জন্য একযোগে বাস্তবায়নের আগে সীমিত পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগ, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে এটিকে আরও পরিপূর্ণ ও পদ্ধতিগত রূপ দেওয়া হবে।
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। তারা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশে এর প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে এ উদ্যোগ নিতে অনেক সময় লেগে গেছে। বিগত সরকারের আমলে এর কাছাকাছি একটি উদ্যাগের কথা আলোচনায় থাকলেও, সমন্বয় না থাকায় এবং রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় তা সামনে এগোতে পারেনি।
কৃষকদের জন্য সরকারি বিভিন্ন সহায়তা এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ একটি ভালো ধারণা হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক ব্যবস্থাপনা, টার্গেটিং এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের ওপর—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা, যেমন ইনপুট ভর্তুকি, প্রদর্শনী প্লট, উপকরণ সরবরাহ, কৃষি মেলা ইত্যাদি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ কৃষকদের সহায়তা করলেও সেগুলো সমন্বিত না হওয়ায় কার্যকারিতা অনেক সময় কমে যায় এবং সঠিক পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সব ধরনের সহায়তাকে একটি ‘আমব্রেলা’ কাঠামোর মধ্যে আনা হলে সুবিধাভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল হবে এবং কোথায়, কীভাবে, কত অর্থ যাচ্ছে—তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে এর বাস্তবায়নকেই মূল সমস্যা হিসেবে দেখছেন কৃষিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জনবলের যে ঘাটতি আছে তা হয়তো আনুষাঙ্গিক উপকরণ সরবরাহ এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, তবে সরকারের চূড়ান্ত সদিচ্ছা না থাকলে এবং পুরো ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগের মতো দুর্নীতির কারণে এটিও কার্যকর করা সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত না করলে এই কর্মসূচি সফল হবে না। তাদের প্রশিক্ষণ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হলেই দেশ ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত—প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃষক যেন ন্যায্য মূল্য ও অধিকার পান, এ লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী কৃষি কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে টাঙ্গাইলসহ দেশের ১১টি স্থানে ‘প্রি-পাইলটিং’ হিসেবে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। পরে পাইলটিং ও পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় চার বছর সময় লাগতে পারে।
ইতোমধ্যে কৃষিমন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, পহেলা বৈশাখে প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা বছরে সরাসরি আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা এবং ১০ ধরনের বিশেষ কৃষি সেবা পাবেন। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় এই কার্ড চালু করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের কৃষকদের এই কার্ডের আওতায় আনা হবে, যা কৃষি খাতের ডিজিটালাইজেশন ও দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করবে।
কৃষক কার্ডের আওতায় ১০টি সেবা হলো—ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ (সার, বীজ) ক্রয়, ন্যায্য মূল্যে সেচ সুবিধা গ্রহণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্প মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা গ্রহণ, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মোবাইলে তাৎক্ষণিক বাজার দর বা তথ্য, কৃষি বিষয়ক আধুনিক প্রশিক্ষণ, ফসলের রোগবালাই দমনের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং কৃষি বীমা সুবিধা।
এক প্ল্যাটফর্মে সব সেবা: সম্ভাবনার জায়গা
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধারণাগতভাবে ‘কৃষক কার্ড’ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, উপকরণ সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বিভিন্নভাবে দেওয়া হলেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন। ফলে সমন্বয়ের অভাব ছিল, মনিটরিংও ছিল দুর্বল।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম মনে করেন, এসব সহায়তাকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে পারলে কার্যকারিতা বাড়বে। তার ভাষায়, ‘একটি কার্ডের মাধ্যমে সব সহায়তা দেওয়া গেলে কে কী পাচ্ছে, তা সহজেই নজরদারি করা সম্ভব হবে। এতে অপচয় কমবে এবং প্রকৃত কৃষককে চিহ্নিত করা সহজ হবে।’
তিনি আরও বলেন, কৃষক কার্ড একটি শক্তিশালী ডেটাবেজ তৈরির সুযোগও তৈরি করতে পারে। কৃষকের জমির পরিমাণ, উৎপাদন ও চাহিদা সম্পর্কিত তথ্য এক জায়গায় এলে সরকার কৃষি পরিকল্পনা—বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুলভাবে নিতে পারবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সঠিক টার্গেটিং ছাড়া এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও প্রায়ই দেখা যায়, যার পাওয়ার কথা সে পায় না, আবার অযোগ্যরাও সুবিধা পেয়ে যায়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বছরে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা খুবই সীমিত। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে কৃষক উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে পারবেন না। জমির পরিমাণ, আয় ও দারিদ্র্য বিবেচনায় সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হলে এটি বেশি কার্যকর হবে।
‘১০ সুবিধা’—ঘোষণায় আছে, বিস্তারিত নেই
কৃষক কার্ডের আওতায় ১০টি সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন কাঠামো এখনো পরিষ্কার নয়—এমন মন্তব্য করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রঞ্জন রায়।
তিনি বলেন, ১০টি সুবিধা যদি কার্যকরভাবে দেওয়া যায়, তাহলে এটি কৃষিখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এগুলো বাস্তবায়ন হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
তার মতে, বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণে সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবায়নই বড় দুর্বলতা। কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতির পাশাপাশি ‘বটম-আপ’ দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা, যাতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়া যায়।
ড. রঞ্জন রায় বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কৃষক ডেটাবেজ তৈরি করা গেলে তা নীতিনির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে কোন কৃষক কত জমিতে কী উৎপাদন করছেন, কত সার প্রয়োজন—এসব তথ্য পাওয়া যাবে।
তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ডেটাবেজ তৈরির জন্য সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো ব্যাংকিং ও ডিজিটাল সেবার পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার নেই। ফলে এসব এলাকার কৃষকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এ ছাড়া অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কার্ডভিত্তিক অনেক কর্মসূচিতে ভুয়া তালিকা, একাধিক কার্ড গ্রহণ ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। কৃষক কার্ডেও একই ধরনের ঝুঁকি এড়াতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি
এদিকে বাংলাদেশ কৃষক মজুর সংহতির সভাপতি দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগের প্রাক-পাইলট কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ বহু আগেই রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আগের সরকারগুলোর বিভিন্ন প্রকল্প, যেমন কৃষক ব্যাংক হিসাব বা ডিজিটাল কৃষি কার্ড প্রকল্প বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, বিলম্ব ও দুর্নীতির কারণে এসব উদ্যোগ জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, শুধু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা আবারও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বিনামূল্যে, বিনা হয়রানিতে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কৃষক কার্ড বিতরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষক প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।