খুলনা পিএমজি আবাসিক
সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা! এ যেন দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা বা এলাকা (কেপিআই এলাকা)! অথচ সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্যই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। আর ডাক বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা খুলনা বিভাগ। কিন্তু খুলনা মহানগরীর বয়রাস্থ বিভাগীয় পোস্টমাস্টার জেনারেলের (পিএমজি) কার্যালয়েই প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের। পেছনের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে—রক্ষাকর্তার ভক্ষকের রূপ যেন প্রকাশ না পায় সেজন্যই এই বাধা।
সূত্র বলছে, সম্প্রতি খুলনা মহানগরীর বয়রাস্থ বিভাগীয় পিএমজি কার্যালয় সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করেই দেদারছে কাটা হচ্ছে গাছ। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই এই আবাসিক এলাকার বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে। সময় এবং সুযোগ হলেই রাতের অন্ধকারে এসব গাছ দফায় দফায় কেটে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই বৃক্ষ নিধনযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন খোদ পিএমজি অফিসেরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এই ঘটনা সামনে আসে গত মে মাসে। এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা স্থানীয়ভাবে মানববন্ধনও করেছে। কিন্তু মানববন্ধনের প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে পরিবেশবাদী সংগঠন, সচেতন নাগরিক ও স্থানীয়দের মধ্যেও। স্থানীয় বেশকিছু পত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বা বন বিভাগও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তাই স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কি দেখার কেউ নেই?
স্থানীয়দের দাবি, গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা কর্মীর উপস্থিতিতে মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়। তাদের অভিযোগ, বন বিভাগের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এই গাছগুলো কাটা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কাটা গাছের আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। তবে গাছের সঠিক সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা শাখার উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি যথাযথ অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা হয়ে থাকে, তবে তা পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
মানববন্ধনে বাপা খুলনাঞ্চলের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অনুমতি ছাড়া এভাবে গাছ কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’ মানববন্ধনে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দিনের পর দিন এলাকাজুড়ে গাছ কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হয়েছে। তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির দাবি জানান।
এ ঘটনায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে হ্যালো পিপলস সমাজকল্যাণ যুব সংস্থার সভাপতি সাবিহা আক্তার রেশমী বলেন, ‘একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এভাবে নির্বিচারে গাছ কাটা উদ্বেগজনক। পরিবেশ রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
পরিবেশবাদী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আপস-এর প্রতিষ্ঠাতা রেদোয়ানুল ইসলাম রোহান বলেন, ‘দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।’
বাপা খুলনাঞ্চলের সদস্য এস এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘খুলনার পরিবেশ রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি—সব প্রতিষ্ঠানেরই আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত।’
সূত্র বলছে, এই বৃক্ষ নিধন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন খোদ খুলনা মহানগরীর বিভাগীয় দক্ষিণাঞ্চলের পিএমজি কবির আহমেদ এবং অতিরিক্ত পিএমজি খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাদেরই নির্দেশনায় নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতিতে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের গাছ কাটা হয়েছে। এসব গাছ ডাক বিভাগের গাড়িতে করে রাতের অন্ধকারে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মূলত মহানগরীয় ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাঠ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে সময়-সুযোগ বুঝে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এ বৃক্ষনিধনের কাজ হরহামেশাই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিএমজি অফিসের ভেতরে অবৈধভাবে কাটা গাছগুলো দীর্ঘদিন চত্বরের এক কোণে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই মূলত বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করেছিল কাঠ চোরাচালান চক্রটি। অবশেষে পরিস্থিতি শান্ত মনে করে গাছগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে ‘ঢাকা মেট্রো-অ-১৪-৩১৩২’ নম্বরের একটি সরকারি গাড়িতে (পিকআপ/কাভার্ডভ্যান) লোড করা হয়। কাভার্ডভ্যানটির পেছনের দড়জাও শক্ত তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কাঠবোঝাই ওই গাড়িটি অফিসের প্রধান গ্যারেজেই পার্ক করে রাখা হয়েছিল। পরে রাতের আঁধারে এই সরকারি কাঠ পাচার করার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। গত ২৯ জুন সোমবার গোপনে কাঠগুলো পাচারের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। গাছভর্তি ওই সরকারি গাড়ির চালক হিসেবে ছিলেন ইনামুল। তিনি পিএমজি অফিসের অভ্যন্তরে অবস্থিত কোয়ার্টার বা ডরমিটরিতেই থাকেন।
এদিকে সরকারি সম্পদ এভাবে লোপাট হওয়া রুখতে প্রশাসনের শীর্ষ মহলের জরুরি ও দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
সামাজিক বন বিভাগ বাগেরহাটের (খুলনা জোন) সহকারী বন সংরক্ষক সুপ্রিয়া হুই নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতে হয়। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এছাড়াও, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সবার। যদি নিয়ম লঙ্ঘন করে গাছ কাটা হয়ে থাকে, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৫ সালে বর্তমান পিএমজি কবির আহমেদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। সে সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ ডাকঘরের প্রধান পোস্টমাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৫ সালের ৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের (সাধারণ) প্রধান কার্যালয়ের লেজারে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার একটি ভুয়া এন্ট্রি বা হিসাব নথিভুক্ত করা হয়েছিল। হিসাবটি ছিল শাহনাজ বেগম লিলির নামে। তিনি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার কবির আহমেদের স্ত্রী এবং সেই কবির আহমেদই বর্তমানে খুলনা মহানগরীর বয়রাস্থ বিভাগীয় পিএমজি হিসেবে কর্মরত। সেসময়ে কবির আহমেদ তার স্ত্রীর হিসাব বইতে ওই জালিয়াতিপূর্ণ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন, কারণ তিনি ওই ডাকঘরেরই পোস্টমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ওইদিনের নগদ লেনদেনের এন্ট্রিতে দেখা যায়, লেজার অপারেটর এবং এলাকা ডাক ব্যবস্থাপক (এড়িয়া পোস্টাল ম্যানেজার-এপিএম) জানিয়েছিলেন, তাদের স্বাক্ষর আসল কালির স্বাক্ষরের সঙ্গে মিলছে না। এপিএম আরও জানিয়েছিলেন, ওইদিন তিনি নিজে ছুটিতে ছিলেন।
সেসময় উপ-পোস্টমাস্টারও (ডেপুটি পোস্টমাস্টার-ডিপিএম) নিশ্চিত করেছিলেন, ৫০ হাজার টাকার বেশি যেকোনো লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিপিএম-এর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। অথচ ২০০৫ সালের ৪ জানুয়ারি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার এন্ট্রিতে তার স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। প্রকৃতপক্ষে ডাকঘরে যে টাকা জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় তৎকালীন সেন্ট্রাল সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পিএমজি আবদুল্লাহ আল মাহবুবুর রশীদ ঢাকা সার্কেলের চিফ পিএমজির কাছে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, কবির আহমেদ ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা অননুমোদিতভাবে নগদে জমা করা এবং ডাক সঞ্চয় হিসাবের তথ্যে কারচুপির ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
তবে ২০০৮ সালের ১৫ এপ্রিল জারি করা একটি অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কবির আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ২০০৭ সালের ১৬ জুন একটি ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ইকবাল মাহমুদের স্বাক্ষরিত ওই আদেশ অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভাগীয় মামলার নথিপত্র (অর্ডার শিট, অভিযুক্তের লিখিত বক্তব্য, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা) পর্যালোচনার পর কবির আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগটি সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে প্রমাণিত হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে নাগরিক প্রতিদিনের খুলনা প্রতিনিধি রোববার (৫ জুন) খুলনা মহানগরীর বয়রাস্থ বিভাগীয় পিএমজি কার্যালয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত অবস্থান করেও পিএমজির সাক্ষাৎ পাননি। এই সময়ে তার কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল।
পরে তিনি খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পিএমজি খন্দকার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) কাজী আবুল হোসেনের মাধ্যমে নাগরিক প্রতিদিনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখে দিয়ে যেতে বলেন। তবে তিনি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।
পরে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুর ২টা ২০মিনিটের দিকে ঢাকা থেকে পিএমজি কবির আহমেদের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে বক্তব্য চেয়ে এসএমএস করে পুণরায় দুপুর আড়াইটার দিকে ফোন করা হলে তার ফোনটি ব্যস্ত পাওয়া যায়।