বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ইরানের শাসন পদ্ধতি বেশ আলাদা। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রোববার (১ মার্চ) দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে এক ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক দেশটিতে ৪০ দিনের শোক ঘোষণার কথা জানান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর খামেনি মারা গেছেন বলে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসনের এই ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে। একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। তাকে উৎখাতের পর ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। তাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়, শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে যার অর্থ সিনিয়র ধর্মীয় নেতা। আলী খামেনির শাসনামলে ইরানে মোট সাতজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছয় সন্তানের জনক।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফও ছিলেন। এ ছাড়া দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার ছিল। এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা—এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনি দিতেন।
প্রেসিডেন্ট খামেনি
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন, পরে যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন তরুণ আলী খামেনি। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং যা বিশ্বাস করতেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালের জুন মাসে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
দুই মাস পর একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে। রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ অর্জন করতে পারেননি।
পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল।
ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল।
আয়াতুল্লাহ খামেনি শাসনামলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন।
খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
খাতামির পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে। তাকে কেউ কেউ আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুসারী মনে করতেন। কিন্তু অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি নিয়ে আহমাদিনেজাদ সরকারের অবস্থান তখন ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে আহমাদিনেজাদ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সঙ্গে তার বিরোধিতা হয়।
সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই দমন অভিযানে অনেক বিরোধী কর্মী নিহত হন, গ্রেপ্তার হন হাজার হাজার মানুষ।
২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন।
এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। পরে তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল ‘আমেরিকার গালে চপেটাঘাত’। খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।’
শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে ‘একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার’ আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলার ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্ট বা ‘ইহুদি গণহত্যা’ আদৌ ঘটেছিল কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
২০১৪ সালে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে উদ্ধৃত একটি বার্তায় বলা হয়েছিল, ‘হলোকাস্ট এমন এক ঘটনা, যার বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, আর যদি ঘটেও থাকে, সেটা কীভাবে ঘটেছিল, তাও স্পষ্ট নয়।’
২০২০ সালে আয়াতুল্লাহ খামেনি ও ইরানের সরকার দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথম সংকটটি শুরু হয় ওই বছর ৮ জানুয়ারি। তখন ইরানের আইআরজিসি ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হয়, যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি নাগরিক।
ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানের ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলো পদত্যাগের দাবি জানায় ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নতুন ঢেউ ওঠে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলির ব্যবহারও করে বলে অভিযোগ ছিল। সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত।’ তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।
ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ছড়িয়ে পড়ে। আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বাছাই হয় কীভাবে
ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি। এই মণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর অন্তর। কিন্তু কারা গোষ্ঠীর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ভর করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল নামে একটি কমিটির অনুমোদনের ওপর। আর এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।
অর্থাৎ এই দুটি পরিষদ বা মণ্ডলীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। গত তিন দশক ধরে আলী খামেনি নিশ্চিত করেছেন, বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল হয়, যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে।
নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল থাকতে পারেন। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হবে একজন আয়াতুল্লাহকে, অর্থাৎ যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা। কিন্তু আলী খামেনিকে যখন নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। তখন তিনি যাতে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল।