১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হলো, সমুদ্রের পানি শোধন করে তৈরি করা পানযোগ্য পানি।
তাদের মতে, একটি কেন্দ্র বা প্ল্যান্ট অকেজো হলে তা সামলানো সম্ভব, কিন্তু অত্যধিক নির্ভরশীল দেশগুলোর একাধিক কেন্দ্রে সফল হামলা হলে জাতীয় সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে; এমনকি দেশত্যাগের হিড়িক বা গণ-অসন্তোষও দেখা দিতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে পানি সরবরাহে প্রধান হুমকি হিসেবে সবসময় ইরানকেই দেখা হয়েছে। কিন্তু গত শনিবার দীর্ঘ চার দশক পর সেই চিত্র পাল্টে গেল।
বিশ্ববাসী যখন রুদ্ধশ্বাসে সেদিন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে এক ‘ভয়ানক ও বেপরোয়া অপরাধের’ জন্য অভিযুক্ত করেন।
তার অভিযোগ, পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপে একটি পানি শোধন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই এই নজির স্থাপন করেছে, ইরান নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার দায় অস্বীকার করলেও পরের দিনই উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য প্রান্তে বাহরাইন ঘোষণা করে, তাদের একটি পানি শোধন কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে।
এর জন্য অভিযুক্ত করা হয় ‘ইরানি আগ্রাসনকে’।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামোগুলোর ওপর একের পর এক পাল্টা হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের শহর ও শিল্পগুলো এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
কিন্তু তারপরই হঠাৎ পানি শোধন কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলা বন্ধ হয়ে গেল। কেন?
উপসাগরীয় অঞ্চলে পানযোগ্য পানি সবসময়ই দুষ্প্রাপ্য পণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে বৃষ্টিপাত খুব কম এবং অনিশ্চিত। তার ওপর বেশিরভাগ দেশে বড় কোনো নদী নেই, যা পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে ওই অঞ্চল সীমিত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেই টিকে ছিল।
কিন্তু গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে তেল শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নষ্ট হয়ে যায় এবং দ্রুত উন্নয়নশীল এই দেশগুলো সমুদ্রের লোনা পানিকে পানযোগ্য করার প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ পানযোগ্য পানি আসে এই শোধন কেন্দ্রগুলো থেকে। ওমানের ক্ষেত্রে এই হার ৮৬ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২ শতাংশ এবং কুয়েতে ৯০ শতাংশ।
এমনকি জর্ডান নদীর সুবিধা পাওয়া ইসরায়েলও তাদের মোট পানযোগ্য পানির অর্ধেক পায় উপকূলীয় পাঁচটি বড় শোধন কেন্দ্র থেকে।
সামষ্টিকভাবে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত শোধিত পানির প্রায় ৪০ শতাংশই তৈরি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। প্রতিদিন তারা প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার লোনা পানি শোধন করার ক্ষমতা রাখে।
জার্মানির হামবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জিয়ো-হাইড্রোইনফরমেটিক্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক নিমা শোকরি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় বেশ কিছু দেশের আধুনিক শহরগুলো এই প্রযুক্তি ছাড়া সচল থাকাই সম্ভব নয়। পানি শোধন কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে দ্রুত পানির সংকট তৈরি হবে।
অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের মতো ২০২৬ সালেও গবেষকেরা বলছেন, এই কাঠামোগত দুর্বলতা আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
শোকরি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক শহর কেবল কয়েকটি বড় উপকূলীয় কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি সফল হামলায় কয়েক দিনের মধ্যেই পানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তেল স্থাপনার মতো এই কেন্দ্রগুলো সহজে বা দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা যায় না। চরম পরিস্থিতিতে সরকার পুরো শহরের জনগণের জন্য পানি রেশনিং করতে বাধ্য হতে পারে।
পানি শোধন কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি বলেছে, এই কেন্দ্রগুলোতে হামলার ফলে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট, ফেরিক ক্লোরাইড ও সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে গত রোববার বাহরাইনে ড্রোন হামলার পর থেকে আর কোনো পানি শোধন কেন্দ্রে হামলা হয়নি।
নিমা শোকরি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ‘কৌশলগত সংযম’ হতে পারে।
তিনি বলেন, পানি শোধন কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো এবং এগুলোতে হামলা চালালে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটার ঝুঁকি থাকে। পানি সরবরাহব্যবস্থায় হামলা জোরদার করলে তা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলতে পারে এবং যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারে।
লোনা পানি শোধনের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল হলেও ইরানের নিজস্ব পানি সমস্যা কিন্তু কম নয়।
বছরের পর বছর ধরে ইরান খরার সঙ্গে লড়াই করছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
শোকরি বলেন, ইরান এরই মধ্যে খরা, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং নদ-নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় তীব্র পানি সংকটের মুখে রয়েছে। পাল্টা হামলায় ইরানের নিজস্ব পানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটির সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
শোকরি সতর্ক করে বলেন, জলাধার, পাম্পিং স্টেশন বা শোধন কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি বিদ্যমান পানি সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।
১৯৮৩ সালে সিআইএ উল্লেখ করেছিল, তেহরান তার আরব প্রতিবেশীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা তাদের পানি শোধন কেন্দ্রগুলোতে হামলা করবে না।
চার দশক পর সেই প্রতিশ্রুতি আজও বজায় থাকবে কি না, এ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
ড্যামিয়েন গেইল দ্য গার্ডিয়ানের পরিবেশবিষয়ক সংবাদদাতা
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া