ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার এক আগাম পরীক্ষা হিসেবে দেশটির দুটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতে শুরু করেছেন। বর্তমানে আসাম, কেরালা এবং পুদুচেরিতে ভোটগ্রহণ চলছে।
নির্বাচনী এই চক্র চলতি মাসের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুতেও বিস্তৃত হবে।
এই পাঁচটি অঞ্চলের সবকটির ফলাফল আগামী ৪ মে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মোদির দল বিজেপির জন্য এই নির্বাচনগুলো কেবল দিল্লি বা কেন্দ্রীয় শাসন টিকিয়ে রাখার লড়াই নয়; বরং ভারতের সেইসব এলাকায় নিজেদের আধিপত্য প্রমাণের লড়াই, যেখানে তারা আগে কখনও জিততে পারেনি।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর জন্যও এটি এক বড় পরীক্ষা—বিজেপির আধিপত্যের বিরুদ্ধে তারা শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হতে পারে কি না।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই পাঁচ অঞ্চলে মোট ১৭ কোটি ৪০ লাখ ভোটার রয়েছেন, যা দেশের মোট ভোটারের প্রায় ১৮ শতাংশ।
বৃহস্পতিবারের (৯ এপ্রিল) এই নির্বাচনে মোট ২৯৬টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। আসামে ১২৬টি, কেরালায় ১৪০টি এবং পুদুচেরিতে ৩০টি।
বিজেপি বর্তমানে আসাম শাসন করছে এবং পুদুচেরিতে ক্ষমতাসীন জোটের অংশ হিসেবে আছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা বা তামিলনাড়ুতে তারা কখনো সরকার গঠন করতে পারেনি। এই রাজ্যগুলোতে তারা শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যারা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে বা ফিরে পেতে লড়াই করছে।
ভারতের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাহুল ভার্মা বিবিসিকে বলেন, ‘এটি বিজেপির জন্য বড় পরীক্ষা, যারা গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারত, বিশেষ করে কেরালা ও তামিলনাড়ুতে নিজেদের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে।’
তবে তিনি মনে করেন, বিরোধী দলগুলোর জন্য, বিশেষ করে কংগ্রেসের জন্য এই নির্বাচন আরও বড় চ্যালেঞ্জ; যাদের নির্বাচনী শক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্রাস পেয়েছে।
রাহুল ভার্মা বলেন, ‘ফলাফল থেকে বোঝা যাবে, কংগ্রেস আসামে কোনো জোরালো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে কি না এবং কেরালায় সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনের জয়কে ধরে রাখতে পারে কি না। এই নির্বাচন থেকে আরও বোঝা যাবে, বৃহত্তর বিরোধী জোট কীভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলগুলো সামাল দিচ্ছে।’
বিবিসি বলছে, এপ্রিলে ভোট হওয়া এই পাঁচ অঞ্চলের নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে।
আসামে দীর্ঘসময় ধরে রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে অভিবাসন, আত্মপরিচয় ও নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে—বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায়। বিজেপি গত এক দশক ধরে রাজ্যটি শাসন করছে। তাই এই নির্বাচন তাদের আধিপত্য বজায় রাখার এক বড় পরীক্ষা।
আসামে নির্বাচনী প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার তীব্র বাগ্মিতা লক্ষ্য করা গেছে। তিনি মূলত অবৈধ অভিবাসন এবং জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সেখানে বাংলাভাষী মুসলমানদের নিয়েও বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
বিপরীতে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা সুশাসন, অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও আঞ্চলিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে।
কেরালা সাক্ষরতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের গড় আয়ুর দিক থেকে ভারতের অন্যতম শীর্ষ রাজ্য। সেখানে নির্বাচনী প্রচার মূলত জনকল্যাণ এবং সুশাসনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
কেরালায় ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবেই কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী) এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর মধ্যে পালাবদল হয়।
গত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থী জোটটি এবার ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
ভারতের এই পাঁচটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল এলাকা পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে ৭ কোটিরও বেশি ভোটার রয়েছেন।
২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যটি শাসন করছেন এবং বিজেপি সেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণ হবে দুই দফায়—২৩ ও ২৯ এপ্রিল। মমতা বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ এবং পশ্চিমবঙ্গের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিরোধী হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে বিজেপি অবৈধ অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে প্রচার চালাচ্ছে, যা বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন এই রাজ্যে তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।
এই লড়াইয়ের ওপর ছায়া ফেলেছে এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্ক। চূড়ান্ত তালিকায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ লাখ ভোটার বাদ পড়েছেন, যাদের অনেকেরই বাড়ি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা মুর্শিদাবাদে।
অন্যদিকে তামিলনাড়ু দীর্ঘদিন ধরে দুটি আঞ্চলিক দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে নিয়ন্ত্রিত। এবার এআইএডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে লড়াই করছে।
রাজ্যটিতে আগামী ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন সুপারস্টার বিজয়ের নেতৃত্বে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কারণে বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
বিজেপি এই রাজ্যে পা রাখতে হিমশিম খেলেও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত এই রাজ্যে সামান্য সাফল্যও তাদের জন্য দক্ষিণ ভারতে বিস্তারের এক বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।
এদিকে ৩০ সদস্যের বিধানসভা নিয়ে পুদুচেরি বর্তমানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অধীনে রয়েছে। সেখানে জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়গুলো প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু।