আল জাজিরার প্রতিবেদন
এটি একটি লেগো সেট; তবে একটু ভিন্নধর্মী। চাঁদের আলোয় ঘেরা এক জনমানবহীন প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে আসছেন এক আদিবাসী আমেরিকান প্রধান। অ্যানিমেটেড এই ভিডিওর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গিয়ে মার্কিন সরকারের হাতে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর আলোকপাত করে। শিকলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান থেকে শুরু করে ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারের বন্দিরাও এখানে রয়েছে।
এরপর ভিডিওর দৃশ্যপট ফের বদলে যায় ইরানের সেনাদের দিকে, যারা বড় বড় ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যানার সাঁটাচ্ছে আর ঠিক তখনই নেপথ্য সংগীতের গতি বেড়ে যায়।
প্রথম ব্যানারে লেখা, ‘অপহৃত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’। পরেরটাতে লেখা, ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য।’ এরপর ১৯৮৮ সালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হওয়া ও ২৯০ জন আরোহীর প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখ করে লেখা, ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর শহীদদের স্মরণে।’
এরপর একে একে আসতে থাকে ২০০৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের বুলডোজারে পিষ্ট হয়ে নিহত আমেরিকান অধিকারকর্মী র্যাচেল কোরির নাম এবং আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের শিকার মানুষের কথা। এমনকি ‘এপস্টিন দ্বীপের শিশুদের’ প্রসঙ্গ টেনে একই ধরনের বার্তাসংবলিত ক্ষেপণাস্ত্র একের পর এক ছুড়ে মারতে দেখা যায়।
ভিডিওটি শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল দুটি মূর্তি ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে; যেখানে বড় ও সাদা অক্ষরে লেখা ওঠে, ‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’।
গত ২৯ মার্চের এই ভিডিও এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুক্তি দেওয়া অনেকগুলো ভিডিওর একটি।
ইরানভিত্তিক বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী বিশ্বজুড়ে পরিচিত লেগো ফিগার ও ব্লক ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভাইরাল ট্রেন্ড তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তেহরানের বয়ানকে শক্তিশালী করছে।
মার্কিন আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ অপরাধের শিকার হওয়া বিভিন্ন মানুষের ওপর নির্মিত এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে প্রায় দেড় লাখ বার দেখা হয়েছে।
সম্প্রতি ইউটিউব থেকে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়। তা সত্ত্বেও তেহরানভিত্তিক এই গোষ্ঠী হাল ছাড়েনি।
তারা বিশেষ সুর ও র্যাপ সংগীতের মাধ্যমে ট্রাম্পকে নিয়ে বিদ্রূপ করে যাচ্ছে; যেখানে প্রায়ই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজের কথা ব্যবহার করে তাকে ভণ্ডামি এবং আমেরিকার স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার এক প্রতিনিধি আল জাজিরাকে জানান, সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে তাদের ইউটিউব চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, লেগোর মতো ব্লক অ্যানিমেশন কোনোভাবেই সহিংস নয়।
তিনি বলেন, ‘এতে হতাশা আছে, কিন্তু অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। এই গল্প নতুন নয়। আমরা ভালো করেই জানি, পশ্চিমারা কীভাবে সত্যকে নীরবতার চাদরে মুড়িয়ে রাখে এবং সত্য বলা প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে।’
গভীর প্রতীকবাদ
ভিডিওগুলোতে শিয়া মুসলিম ইতিহাসের বিষাদময় গল্প থেকে শুরু করে প্রাণবন্ত র্যাপ ঘরানার মিউজিক ভিডিও সবই ফুটে উঠেছে লেগোর মতো ব্রিক ফিগার এবং পরিবেশের মাধ্যমে।
এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র জানান, অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত সবুজ ও লাল রঙের বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।
তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সবুজ রং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে লাল রং জালেম বা অত্যাচারীর প্রতীক।
এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার ওই মুখপাত্র বলেন, ‘এটি আসলে আমাদের দলের অন্যতম প্রিয় একটি অ্যানিমেশন। বিশেষ করে যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলোর ওপর যুদ্ধের হেলমেট রাখা হয়। সেই মুহূর্তটি সত্যিই অসাধারণ ছিল।’
অন্যান্য ভিডিওতে ‘এপস্টিন শাসন’, ‘লুজার’ (পরাজিত)-এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের মাথায় ‘মাগা’ (ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন) লেখা লাল রঙের টুপি পরা অবস্থায় দেখানো হয়েছে।
ভিডিওগুলোতে ট্রাম্পের সেসব প্রতিশ্রুতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানো এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পাশে থাকার কথা বলেছিলেন।
এরপর খোদ প্রেসিডেন্টের নিজের কথা ব্যবহার করেই তার বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরায়েলের দাবিকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
গোষ্ঠীটির মুখপাত্র বলেন, “‘লুজার’ আমাদের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। ট্রাম্প প্রায়ই তার বিরোধীদের এই নামে ডাকেন। তাই আমরা বিষয়টিকে উল্টে দিয়েছি এবং দেখিয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে বড় লুজার।”
ভিডিওর কোথাও কোথাও ট্রাম্পের মতো দেখতে সেই ফিগারটিকে একটি ছোট পুতুল ধরে থাকতেও দেখা যায়।
অন্য আরেক ভিডিও লেবাননের জনগণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের ছেড়ে যাবে না। লেবাননে মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টিরও বেশি বোমাবর্ষণের সেই ভয়াবহ হামলার পর ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।
এই ভিডিওগুলো তৈরির নেপথ্যে রয়েছে ১০ জনের একটি দল, যাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।
তাদের কাছে স্পষ্টভাবেই ইন্টারনেট ব্যবহারের অবাধ সুযোগ রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোও অন্তর্ভুক্ত। অথচ যুদ্ধের শুরু থেকেই সাধারণ ইরানিদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ করে রেখেছে সে দেশের সরকার।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র স্বীকার করেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অন্যতম গ্রাহক। তবে তিনি দাবি করেন, তাদের গোষ্ঠীটি সম্পূর্ণ স্বাধীন।
ওই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা উচ্চমানের মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করি। তাই বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, প্রচারের জন্য মাঝে মাঝে আমাদের কাজ কিনে নেয়। এটাই স্বাভাবিক।’
‘আমরা আগে কন্টেন্ট তৈরি করি। যদি এর মান যথেষ্ট ভালো হয়, তাহলে সংবাদ সংস্থাগুলো তা আমাদের কাছ থেকে কিনে নেয়। এভাবে আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় থাকে,’ যোগ করেন তিনি।