আঙ্কারা যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সিরিয়ার স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন গ্রিস ও সাইপ্রাসকে সঙ্গে নিয়ে তুরস্ককে ‘ঘিরে ফেলার’ এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে ইসরায়েল।
২২ ডিসেম্বর দামেস্কে তুরস্কের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা প্রধানরা সিরিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঠিক একই দিনে ইসরায়েল গ্রিস ও সাইপ্রাসের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি আঙ্কারা ও দামেস্কের জন্য একটি বার্তা যে, ইসরায়েল সিরিয়ার পুনর্গঠনে বাধা দিতে প্রস্তুত।
আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন এই ত্রিপক্ষীয় জোট জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগের কথা বললেও, বাস্তবে এটি এখন নিরাপত্তা ও সামরিক সমন্বয়ের দিকে মোড় নিয়েছে। তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ সামুদ্রিক তত্ত্বের অন্যতম স্থপতি অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেম গুরদেনিজ আল জাজিরাকে বলেন, এই বৈঠকের লক্ষ্য হলো তুরস্ককে বাদ দেওয়া এবং তাকে ঘিরে ফেলা। এটি কেবল জ্বালানি নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়, বরং তুরস্কের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করে তাকে পিছু হটতে বাধ্য করার একটি কৌশল।
ইসরায়েলের জন্য এই জোটের গুরুত্ব অপরিসীম। সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার যে প্রচেষ্টা তুরস্ক চালাচ্ছে, তা ইসরায়েলের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ইসরায়েল বরং একটি খণ্ডিত ও অস্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পছন্দ করে। অন্যদিকে, গ্রিস ও সাইপ্রাস এই অংশীদারিত্বকে ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগরে তাদের সামুদ্রিক সীমার দাবি জোরালো করতে এবং তুরস্ককে জ্বালানি করিডোর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
ইসরায়েল, সাইপ্রাস ও গ্রিসের বৈঠকে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস ও সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোডৌলিডিসের পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু তুরস্কের নাম না নিয়ে সতর্ক করে বলেন, যারা তাদের সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কল্পনা করছেন এবং আমাদের ভূমির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চান। এটিকে অটোমান সাম্রাজ্যের পুনরুত্থানের তুর্কি আকাঙ্ক্ষার প্রতি কটাক্ষ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এই ত্রিপক্ষীয় জোট এখন আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রিস ইতিমধ্যেই ইসরায়েল থেকে ৭৬০ মিলিয়ন ডলারের রকেট আর্টিলারি সিস্টেম কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এ ছাড়া দেশ দুটি ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। সাইপ্রাসও গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজের পরিচালক জেইনেপ আলেমদার বলেন, তুরস্ক অবশ্যই তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মাধ্যমে এই জোটকে দুর্বল করার চেষ্টা করবে। তবে এই অঞ্চলে ইসরায়েল ও তুরস্কের স্বার্থের সংঘাত আরও মুখোমুখি অবস্থানের দিকে নিয়ে যাবে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, এজিয়ান ও ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক তার অধিকার লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ দেবে না। ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর যে অদূর ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে, সেই ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।