দায় চাপালেন ভিসির ওপর
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও জুলাই গণহত্যার সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নেতাদের হাতে আটক শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান শুভকে ছেড়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার আবেদনও গ্রহণ করেননি হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুর রহমান।
পুলিশ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। অপর দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে ভিন্ন কথা।
এ অবস্থায় ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ আড়াল করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসু নেতাদের ব্যবহার করেছে বলে সমালোচনা করছেন শিক্ষার্থীরা।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করছিলেন আইন বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর রোমান শুভ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এর একটির প্রতিবেদনে অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় তার বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় তার বিষয়ে আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে চাকসু নেতারা আইন অনুষদ ভবনে গেলে খবর পেয়ে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করেন ওই শিক্ষক। এ সময় তাকে ধরে প্রক্টর অফিসে নেন চাকসু নেতারা।
এদিকে দিনভর নাটকীয়তার পর রাত ৯টার দিকে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অপরদিকে চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদের নেতৃত্বে একটি দল বিকেলে হাটহাজারী থানায় রোমান শুভর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করতে যান। কিন্তু ওসি মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ বলেন, রোমান শুভর বিরুদ্ধে আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের মানসিক নিপীড়ন, জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো, ছাত্রলীগ লেলিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছি। এ অবস্থায় তিন ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করলেও হাটহাজারী থানার ওসি মামলা নেননি।
তৌহিদ আরও বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থন জোগানো এবং আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া অপরাধ। কিন্তু প্রমাণ থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং থানা আমাদের সহযোগিতা করেনি। ওসি বলেছেন এক্ষেত্রে এসপির অনুমতি লাগবে। কিন্তু এ ধরণের কোনো বিধান বাংলাদেশের আইনে নেই।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার (ওসি) জাহেদুর রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। মামলা নেওয়া হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মামলা না নেওয়ার তথ্য সঠিক না। ভিসি-প্রোভিসি আপস করেছেন।
আপসের অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খান আপসের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, রোমান শুভর বিরুদ্ধে একাডেমিক ইনকয়ারি চলছে। ছাত্রদের ওর উপর অনেক রাগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু আমাদের এডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়েতে আগাতে হবে। ছাত্ররা আবেদন করেছে, পরে যাচাই-বাছাই করতে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ফার্স্ট কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে, আমরা সেকেন্ড কমিটির রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি।
মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কে মামলা করবে না করবে এটা তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে না। কোন নাগরিক যদি কোন থানায় মামলা করতে যায় কারো বিরুদ্ধে, সেটা যে কোন লোকই করতে পারে। সেটা তো ওনাদের (থানা) বিষয়, আমাদের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে পৃথক কোনো বিধান রয়েছে কিনা জানিতে চাইলে প্রোভিসি বলেন, ইউনিভার্সিটি টিচারের বেলায় মামলা নেওয়া যাবে না, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এরকম কোন ইন্সট্রাকশন নাই। আমাদের শুধু না, যেকোনো লোকেরই যেকোনো থানায় মামলা করার, অভিযোগ করার অধিকার রয়েছে।
‘নিয়োগ বাণিজ্য’ আড়াল করতে নাটক সাজানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান বলেন, নিয়োগ বাণিজ্য হচ্ছে এরকম একটা সিঙ্গেল প্রমাণও কেউ দিতে পারবে না। এ বিষয়ে যে তথ্যটা ছড়ানো হয়েছে এটা মিথ্যা তথ্য। আমাদের এখানে ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যে বছরের লোকজন রিটায়ারমেন্ট যাবে, সেটা স্বেচ্ছায় হোক বা নরলাম অথবা মৃত্যুজনিত কারণ হোক, যে সমস্ত ফোর্স আছে— এগুলো অর্থবছরে ফিলআপ না করলে পরবর্তীতে এই বাজেটগুলো কর্তন করে ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর অনেক বাড়াচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন কর্মকাণ্ডটা অনেক বেড়ে গেছে। এখনো অনেক ডিপার্টমেন্টে স্টাফ নেই। যেমন- সংগীত ডিপার্টমেন্ট, নাট্যকলা ডিপার্টমেন্ট। আমাদের এখানে যে পরিমাণ লোক নিয়োগ হয়েছে, এগুলো আসলে গত ১৫-১৬ বছর ধরে যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই পোস্টগুলোকেই পারমানেন্ট করা হয়েছে; এই সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি। আর যেসব নিয়োগ হচ্ছে সব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। এক্ষেত্রে যেসব তথ্য ছড়াচ্ছে তা মিথ্যা। চাকসুকে ব্যবহার করার প্রশ্নই আসে না।