রাজধানীর মগবাজারের আউটার সার্কুলার রোডের ঘিঞ্জি গলিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মূলত একটি ‘টাইম বোমা’! ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা আর লাল নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মানুষের জীবনকে স্রেফ জুয়ার গুটি বানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দৃশ্যমান আগুন লাগেনি, কিন্তু ভেতরে তৈরি হয়ে ছিল এক অদৃশ্য ‘গ্যাস চেম্বার’।
কেন এই গ্যাস চেম্বার? উত্তর লুকিয়ে আছে ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ ও গোলকধাঁধার মতো নকশায়। মূল ভবন থেকে অনেক ভেতরে ওয়ার্ডে পৌঁছাতে হলে ভাঙতে হয় একের পর এক দেয়াল আর স্তর। এ বিষয়ে আমেরিকান সোসাইটি অব হিটিং, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং ইঞ্জিনিয়ার্স (অ্যাশরে) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি হাসমত উল্লাহ বলেন, ‘রুমের ভেতর রুম, তার ভেতর রুম, তার ভেতর রুম। তার মানে ওই রুমের দরজাটা যদি কেউ খোলেও, তাতেও কিন্তু ফ্রেশ এয়ার আসবে না।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেখানে ১০টি বাতাসের প্যারামিটার নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেখানে এই হাসপাতালে ব্যবস্থা আছে মাত্র একটির! ফলে সামান্য গ্যাস লিক কিংবা ধোঁয়া জমলেই এই কক্ষটি পরিণত হয় এক মরণফাঁদে, যার বিষাক্ত বাতাস শিশুদের সহনশীলতার মাত্রার চেয়ে লাখো গুণ বেশি মারাত্মক।
লোভ আর নিয়ম ভাঙার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলেছে আদ্-দ্বীনে। ১৯৯৭ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই হাসপাতাল ২০০৮ সালে ‘উইমেন্স মেডিকেল’ এবং ২০১৯ সালে ‘অধ্যাপক আশরাফ আলী ভবন’ গিলে খেয়ে একের পর এক পরিধি বাড়িয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কোনো ডিজাইন বা মাস্টার প্ল্যানের বালাই ছিল না। জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে এই বহুতল কাঠামো।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান সরাসরি আঙুল তুলেছেন অব্যবস্থাপনার দিকে। তিনি বলেন, ‘কোনো সুনির্দিষ্ট এয়ার কন্ডিশনিং কোড মানা হয়নি এখানে। অন্যান্য সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয় করে যে মাস্টার প্ল্যান থাকার কথা, তা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। নেই কোনো ফায়ার রেসপন্স বা ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্ল্যান।’ তার হুঁশিয়ারি, যেকোনো দুর্যোগে যদি এখানে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে, তবে তাকে দুর্ঘটনা বলা পাপ হবে, ওটা হবে স্রেফ একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’!
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও এক বিস্ফোরক তথ্য। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল যে শুধু নিয়ম মানেনি তা নয়, তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছে শুরু থেকেই। ২০১৭ সালে ফায়ার সার্ভিস পুরো হাসপাতালটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের।
২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট বিশেষ পরিদর্শনে গিয়ে ফায়ার ফাইটারদের চোখ কপালে ওঠে! এত বড় একটা হাসপাতাল, অথচ সেখানে কোনো ফায়ার এক্সিট নেই, নেই কোনো স্প্রিঙ্কলার, স্মোক ডিটেক্টর কিংবা একটা সাধারণ অ্যালার্ম সিস্টেম!
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি তিন মাসের আলটিমেটাম দিয়ে হাসপাতালটিকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। আর সেই নোটিশেই ফাঁস হয় সবচেয়ে বড় সত্য, জন্মলগ্ন থেকেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্রই ছিল না!
এ ব্যাপারে বারবার যোগাযোগ করা হলেও কোন বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এই মৃত্যু ফাঁদ শুধু আদ্-দ্বীনের একার পাপ নয়। এর দায় এড়াতে পারে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোও। তারা বছরের পর বছর কেবল চিঠির পর চিঠি পাঠিয়েছে, কাগজের পিঠ বাঁচিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই মরণফাঁদ বন্ধ করতে বা সিলগালা করতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
আজ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল একটি প্রতীক মাত্র। ঢাকার বুকে এমন হাজারো বেসরকারি লাইফ-সাপোর্টহীন হাসপাতাল প্রতিদিন মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এখনই একটি শক্তিশালী যৌথ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, পরে যেকোনো বড় মৃত্যুর মিছিলের দায় কিন্তু এই রাষ্ট্র আর প্রশাসনকেই নিতে হবে।