ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর
অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত ও নদী রক্ষার দাবিতে ফারাক্কা লংমার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে রাজধানীতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে নাগরিক সমাজ। শনিবার (২৩ মে) সকালে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে নদী, পানি ও পরিবেশ সুরক্ষায় ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
মানববন্ধনে নাগরিক সমাজের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং কৃষি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে।’ ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘নদী বাঁচানো মানেই দেশ বাঁচানো।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নে বাংলাদেশকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। নদী কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।’ তাই পানি অধিকারকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করার আহ্বান জানান তিনি।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় দেশের জন্যই বিপর্যয় ডেকে এনেছে।’ তিনি গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন, তিস্তা চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সামগ্রিক পানি চুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রিভারাইন পিপলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, নদী বিষয়ক চুক্তি শুধু দ্বিপাক্ষিক হলে চলবে না, বরং অববাহিকাভিত্তিক আঞ্চলিক চুক্তি প্রয়োজন। এ ধরনের চুক্তিতে ভুটান, নেপালসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পানি কূটনীতি গড়ে তোলার কথাও বলেন।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, ‘নদীর ন্যায্য হিস্যা যেমন বাংলাদেশের অধিকার, তেমনি উজানের দেশগুলোর জনগণেরও অধিকার রয়েছে।’ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সবার স্বার্থ রক্ষা করে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘মাওলানা ভাসানী অনেক আগেই বুঝেছিলেন যে বাঁধ নির্মাণ নদীর ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নীতিমালায় স্বাক্ষর করলেও প্রতিবেশী দেশগুলো তা করেনি।’ এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি এবং বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে জনপরামর্শ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মোসাম্মৎ সুলতানা বেগম বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ বারবার পানির সংকট ও বন্যার মুখে পড়ছে।’ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিতে ন্যায্য পানি হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে বলে দাবি জানান তিনি।
স্টেপ টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের পরিচালক রঞ্জন কর্মকার বলেন, ‘জনগণের ন্যায্য পানির অধিকার আদায়ে নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে হবে এবং সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় নদী ও খাল রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।’
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ‘ফারাক্কা লংমার্চ কেবল বাঁধবিরোধী আন্দোলন নয়; এটি অভিন্ন নদীর অস্তিত্ব, জীবন-জীবিকা ও উন্নয়ন দর্শনের প্রশ্ন।’ নদীকে শুধু কিউসেক হিসেবে ভাগ করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নদীর নিজস্ব প্রাণ ও প্রবাহ রয়েছে।’ তাই মাওলানা ভাসানীর পানি দর্শনকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘উজানে পানি আটকে রেখে কিউসেকের হিসাব দেখানো আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করার শামিল।’ বাংলাদেশের নদী প্রবাহ ও জনগণের জীবন রক্ষায় ন্যায্য পানি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানববন্ধনে আরও সংহতি জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নিজেরা করি, বেলা, ব্লাস্ট, সিসিডিবি, ইনসিডিন বাংলাদেশ, বারসিক, বাদাবন, গ্রিন ভয়েস, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বনলতা নারী উন্নয়ন সংস্থা, কেরানীগঞ্জ হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠন।
কর্মসূচি থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ১৬ মে-কে ‘জাতীয় পানি অধিকার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা, গঙ্গা-তিস্তা সহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করে গ্যারান্টি ক্লজ সংযোজন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের মতো বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে জনপরামর্শ ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা।