রোহিঙ্গা সংকট নবম বছরে পদার্পণ করলেও ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) বাস্তবায়ন কাঠামো থেকে স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সিদ্ধান্ত স্থানীয়করণ অঙ্গীকারের পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন কক্সবাজারের স্থানীয় অংশীজনরা।
মঙ্গলবার কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরামের (সিসিএনএফ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তারা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি বছর জেআরপি প্রণয়ন করা হলেও জেআরপি ২০২৬-এ স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।
‘ইউএনএইচসিআরকে অবশ্যই স্থানীয় এনজিওদের অংশীদারিত্বে অগ্রাধিকার দিতে হবে; জেআরপিতে স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ বরাদ্দ স্থানীয়করণ অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তারা অভিযোগ করেন, জেআরপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের বক্তব্যের প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। বক্তাদের মতে, বৈশ্বিক স্থানীয়করণ প্রতিশ্রুতির আলোকে জেআরপিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ‘জেআরপি ২.০’ নামে একটি নতুন কাঠামোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
সিসিএনএফের প্রধান মডারেটর রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকার ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় এনজিও প্রতিশ্রুতির আঞ্জুমান আরা বলেন, পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো এবারও জেআরপি ২০২৬ স্থানীয় এনজিওদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়নি। তিনি জেআরপি বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিও ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. ইকবাল উদ্দিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপভিত্তিক ‘জেআরপি ২.০’ প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। স্থানীয় সংগঠনগুলো সরাসরি তহবিল থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাহরিমা আফরোজ টুম্পা জেআরপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় অংশীজনদের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য দেওয়ার প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল কবির বলেন, জেআরপি ২০২৬-এ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনার আলোকে এ বরাদ্দ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর আহমদ কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অব্যাহত আগমন স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন। কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমির নুরুল ইসলাম জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার ইয়ুথ ফোরামের নাসিমা আখতার অভিযোগ করেন, একটি স্থানীয় এনজিও ৩০টিরও বেশি প্রকল্প পেলেও অনেক স্থানীয় সংগঠন কোনো প্রকল্প পায়নি। তিনি স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন কক্সবাজার পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেওয়াজ মো. সেলিম, কক্সবাজার উইমেন চেম্বার অব কমার্সের জাহানারা ইসলাম এবং কক্সবাজার প্রেসক্লাবের মমতাজ উদ্দিন বাহারী। এ সময় সিসিএনএফের সদস্যবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।