যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত নির্বাহী আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার (৩০ জুন) ছয়-তিন ভোটে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছেন বিচারপতিরা।
আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঁচ বিচারপতি রায়ে বলেন, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন ট্রাম্প যে নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর পরিপন্থী। সংশোধনীতে হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক।
তবে রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানাফ ভিন্ন মত দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের আদেশটি ফেডারেল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও এটি সংবিধান লঙ্ঘন করে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের তৃতীয় বড় রায় এটি। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে তার আরোপিত শুল্কনীতি বাতিল করা হয়। এ ছাড়া সোমবার দেওয়া আরেক রায়ে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের উদ্যোগেও বাধা দেয় আদালত।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ছয়-তিন রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, এদের মধ্যে তিন বিচারপতিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালত তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস জানান, ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা পাল্টানোর পক্ষে পর্যাপ্ত ভিত্তি দেখাতে পারেনি। আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই, নাগরিকত্ব মানে অধিকার ভোগের অধিকার ও রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার।
জন রবার্টস বলেন, ‘গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দাসসহ সবার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতেই ১৪তম সংশোধনী যুক্ত করা হয়েছিল। আজও আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।’
অন্যদিকে রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গোরসাচ ভিন্নমত পোষণ করেন। তাদের মতে, ১৪তম সংশোধনী ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে সমর্থন করার সুযোগ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের আওতাধীন সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কেবল সেই শিশুদের জন্য প্রযোজ্য হতো, যাদের অন্তত একজন অভিভাবক মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা। ফলে অস্থায়ী ভিসাধারী কিংবা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী অভিভাবকদের সন্তানরা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকত্ব পেত না।
ভিন্নমত পোষণ করে বিচারপতি থমাস বলেন, ১৪তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা।
তিনি লেখেন, কৃষ্ণাঙ্গরা নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী ছিলেন, কারণ তারা আমেরিকান ছিলেন। তাদের অন্য কোনো মাতৃভূমি ছিল না, তারা অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল ছিলেন না। কিন্তু বিদেশি অস্থায়ী দর্শনার্থীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রযোজ্য নয়।
ট্রাম্পের পক্ষে বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো বলেন, ‘এ রায়ের ফলে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা অবস্থানের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এই সিদ্ধান্ত এমন একটি মধ্যযুগীয় নাগরিকত্ব নীতি বহাল রাখল, যা যুক্তরাজ্যও বহু আগেই পরিত্যাগ করেছে।’
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি কখনো কার্যকর হয়নি। আদেশ জারির পরপরই নিম্ন আদালতগুলো তা স্থগিত করে দেয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের ন্যাশনাল লিগ্যাল ডিরেক্টর সিসিলিয়া ওয়াং বলেন, ‘আদালতের এ সিদ্ধান্ত আমেরিকার একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, আপনি যদি এ দেশে জন্মগ্রহণ করেন, তাহলে আপনি নাগরিক। কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না।’
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কূটনীতিকদের সন্তানদের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দেশটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সবাই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারী।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং নাগরিক অধিকার সংগঠন একাধিক আদালতে মামলা করে। বিষয়টি নিয়ে রায় দেওয়া প্রতিটি আদালতই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
তথ্যসূত্র: এনবিসি