ভূমিহীনদের জন্য খাসজমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু এবং ভূমি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) আয়োজিত ‘ভূমি সুশাসন ও ভূমিতে প্রান্তিক মানুষের অধিকার: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এ দাবি জানান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশে বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমি থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন মানুষ এখনো জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। এ পরিস্থিতির অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মানবাধিকারকর্মী, নিজেরা করি’র সমন্বয়ক এবং এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
প্রবন্ধে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খাসজমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম জোরদারে ১৪ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে খাস কৃষিজমি বণ্টন কার্যক্রম দ্রুত শুরু, খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালায় নারীর ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শর্ত বাতিল, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, খাসজমি তথ্যভান্ডার গঠন, ভূমিহীনদের তালিকা প্রণয়ন, আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, নগর দরিদ্রদের আবাসন, ভূমি খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে পৃথক সেল গঠন এবং ভূমি ও কৃষি সংস্কারের জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি।
প্যানেল আলোচনায় বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘ভূমিদস্যুরা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে খাসজমিতে বসবাস করেও অনেক ভূমিহীন পরিবার বন্দোবস্ত পাচ্ছে না। ভূমিহীনদের খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।’
ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, ‘ভূমি আন্দোলনকে কেবল সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নয়, জনগণের সম্পৃক্ততায় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।’ তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট উদ্বাস্তু সমস্যাকে ভূমি অধিকারের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকারি জমি দখলের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া পটুয়াখালী, ভোলা ও সাতক্ষীরার ভূমিহীন সংগঠনের নেতারা জানান, তারা ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে চরের খাসজমিতে বসবাস করলেও এখনো বন্দোবস্ত পাননি, বরং স্থানীয় প্রভাবশালীরা সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবৈধভাবে জমি বন্দোবস্ত নিয়ে তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং মিথ্যা মামলায় জড়াচ্ছে। তারা জানান, ২০২৪ সালে ভোলায় এক ভূমিহীন নেত্রীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরার দেবহাটার নোড়াক চক গ্রামের ভূমিহীন নেতা আব্দুল জব্বার, পটুয়াখালীর গলাচিপার চরবাংলা গ্রামের ভূমিহীন নেত্রী মাহমুদা বেগম, চরশাহজালাল গ্রামের ফাতেমা বেগম, ভোলার চরফ্যাশনের সিকদারের চরের আলম বাচ্চু মেলকার, অন্যচিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম।
সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, ‘দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে এবং অধিকাংশ মামলাই ভূমিকে কেন্দ্র করে।’ তিনি নাগরিকদের ভূমি-সংক্রান্ত আইন, নীতিমালা ও বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সংগঠিত জনশক্তি গড়ে তুলেই ভূমি ও কৃষি সংস্কারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে।’ একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দলবদ্ধভাবে ন্যায্য দাবি উত্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।