বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় অর্জন করেছে দেশীয় প্রযুক্তি স্টার্টআপ থ্রেডব্রিজ (threadBridge)। ফ্যাশনশিল্পের ‘নোবেল পুরস্কার’ হিসেবে পরিচিত গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সুইডেনের স্টকহোম সিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. রিদওয়ান হোসাইন দলের পক্ষে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। এ সময় সঙ্গে ছিলেন আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ মাজ।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এই বছরের পুরস্কারজয়ী ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান থ্রেডব্রিজ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তানজানিয়ার উদ্ভাবকদের সঙ্গে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের তৈরি পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। এবার সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন মাত্রা—পোশাকশিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়া আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
থ্রেডব্রিজ পুরস্কার পেয়েছে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত স্মার্ট গ্লাস প্রযুক্তির জন্য। এ প্রযুক্তির সাহায্যে কাপড় কাটার আগেই ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেন পরিদর্শকেরা। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় প্রায় ৯০ শতাংশ কাপড় পরীক্ষা ছাড়াই কাটার পর্যায়ে চলে যায়। পরে কাপড়ের ত্রুটি ধরা পড়লে অপচয় হয় কাঁচামাল, জ্বালানি ও অর্থের।
এ সমস্যা সমাধানে স্মার্ট গ্লাসের পাশাপাশি প্রচলিত কাপড় পরিদর্শনযন্ত্রে সংযুক্ত করা যায়—এমন উচ্চগতির ফ্যাব্রিক ইন্সপেকশন মডিউলও তৈরি করেছে থ্রেডব্রিজ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব প্রযুক্তি শ্রমিকদের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তাঁদের কাজকে আরও কার্যকর করতে তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রের গতিতে কাপড় পরীক্ষা করা গেলেও গুণগত মান নিশ্চিত করার কাজে মানুষের ভূমিকা অক্ষুণ্ন থাকবে।
শুধু তৈরি পোশাকশিল্পেই নয়, ভারী শিল্পেও নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। গাজীপুরের একটি কারখানায় ১৫টি উৎপাদনযন্ত্রে থ্রেডব্রিজের স্টিলগার্ড (SteelGuard) ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইস্পাতের পাইপ পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক প্রয়োগে উৎপাদনজনিত অপচয় ও পুনরায় কাজ করার প্রয়োজন কমিয়ে প্রায় ৩৭ টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
প্রযুক্তিগুলো বাস্তব কারখানায় প্রয়োগের জন্য স্থানীয় জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে থ্রেডব্রিজ। ফলে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি দেশের প্রকৌশলী ও দক্ষ কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
পুরস্কার গ্রহণের অনুভূতি জানিয়ে রিদওয়ান হোসাইন বলেন, “স্টকহোমে এই পুরস্কার গ্রহণের সময় আমার মনে পড়ছিল কারখানার উৎপাদন লাইনে কাজ করা শ্রমিকদের কথা। এই স্বীকৃতি তাঁদের এবং বাংলাদেশের সেই তরুণ প্রকৌশলীদের, যাঁরা দেশের সমস্যার সমাধান দেশেই করতে চান।”
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ শিল্প দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। কারখানায় কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন, দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন না হওয়ায় শিল্পটি পিছিয়ে রয়েছে। সেই সমস্যার সমাধানেই তাঁরা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছেন।
২০২৬ সালের জুনে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। তখন এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য কার্ল-ইয়োহান পারসন বলেছিলেন, প্রয়োজনীয় সমাধানগুলো ইতিমধ্যে রয়েছে; ঘাটতি হচ্ছে সেগুলো দ্রুত ও ব্যাপক পরিসরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডের বিজয়ী হিসেবে থ্রেডব্রিজ পাচ্ছে দুই লাখ ইউরো অনুদান। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশনের এক বছরব্যাপী ‘চেঞ্জমেকার প্রোগ্রামে’ অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর লক্ষ্য প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ বাড়ানো এবং উদ্ভাবনকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া।
থ্রেডব্রিজ ‘বিল্ড বাংলাদেশ’-এর নিডল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জেরও স্নাতক প্রতিষ্ঠান। এ উদ্যোগ তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তাদের সহায়তা করে।
ঢাকাভিত্তিক থ্রেডব্রিজ তৈরি পোশাক, ইস্পাত উৎপাদন ও কৃষি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ত্রুটি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে Garments QC, Smart Glass, SteelGuard ও Crop AI।
২০১৫ সাল থেকে এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশন পরিচালিত গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডের লক্ষ্য বস্ত্রশিল্পে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো। প্রতিবছর নির্বাচিত ১০ বিজয়ী প্রতিষ্ঠানকে মোট ২০ লাখ ইউরো অনুদান দেওয়া হয় এবং উদ্ভাবনকে সম্প্রসারণে সহায়তা করতে যুক্ত করা হয় এক বছরব্যাপী বিশেষ কর্মসূচিতে।
থ্রেডব্রিজের এই অর্জন বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়; স্থানীয় শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিশ্ববাজারে তুলে ধরার সক্ষমতাও অর্জন করছে।