ময়মনসিংহে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেল ও রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত ১২ দিনে একই হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে মোট পাঁচ শিশুর মৃত্যু হলো, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রোববার (২৯ মার্চ) সকাল ১০টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত ৬৬ জন শিশু বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিন শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। এতে করে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং হাসপাতালের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটে ছয় মাস বয়সী নুরুন্নবী নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের সন্তান। গুরুতর অবস্থায় বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
এর আগে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মারা যায় সাত মাস বয়সী লিয়ন নামের আরেক শিশু। সে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের ছেলে। গত শুক্রবার দুপুরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
লিয়নের বাবা আবদুর রহিম জানান, ঈদের আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ছেলেকে বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে তার শরীরে হাম দেখা দিলে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একমাত্র সন্তানকে হারাতে হয়।
চলতি মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৪ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক মেডিক্যাল টিম গঠন করে এবং শিশু ওয়ার্ডের তিনটি কক্ষকে ‘হাম/মিসেলস কর্নার’ হিসেবে নির্ধারণ করে।
প্রতিটি কর্নারে ১০টি করে শয্যা থাকলেও রোগীর চাপ এত বেশি যে সেগুলোতেও আর জায়গা হচ্ছে না। ফলে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকেই জটিলতায় ভুগছে।
হামের পাশাপাশি ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা যাচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা জানান, হাম আক্রান্ত শিশুরা শুধু জ্বর নয়, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে আইসোলেশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি একটি বড় কারণ হতে পারে। মার্চ মাসেই সারাদেশে অন্তত ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বর, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখারও গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।