মানিকগঞ্জে নদীপাড়ের মানুষের কাছে ত্রাসের অপর নাম ‘বালুমহাল’। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ ও বিধিবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী ও গাজীখালিসহ বিভিন্ন নদীতে ভাঙন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে প্রতি বছর শত শত পরিবার ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা জানান, প্রাকৃতিক কারণে নদীভাঙন দেখা দিলেও বালুমহালের আশপাশে ড্রেজার দিয়ে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করলেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি।
তথ্য বলছে, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে ইজারাদারদের চুক্তি হয়। তবে বিগত বছরগুলোতে অনেক ইজারাদার নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করেছেন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে শ্রমিকদের জরিমানা বা স্বল্পমেয়াদি সাজা হলেও মূল ইজারাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মানিকগঞ্জে তিনটি বালুমহালের দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত ২৯ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উন্মুক্ত দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। উপযুক্ত দরদাতা না থাকায় হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল দ্বিতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এছাড়া মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহালের ইজারা পেয়েছে বিজু এন্টারপ্রাইজ, যার দায়িত্বে রয়েছেন পৌর বিএনপি যুগ্ম আহবায়ক মো. কামাল হোসেন। শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল পেয়েছে একরাম এন্টারপ্রাইজ, যার দায়িত্বে রয়েছেন জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন খান।
হরিরামপুর উপজেলার ধুলশুড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে সব হারিয়ে নতুন করে ১৪ শতাংশ জমিতে ঘর তুলেছিলাম। এবার ড্রেজার মেশিনে বালু তোলার কারণে সেই জমিও নদীতে চলে যাচ্ছে।’
একই উপজেলার সেলিমপুর চরের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘পদ্মার ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ সর্বশান্ত হয়েছে। গত কয়েক বছরে বালু কাটার কারণে ভাঙন আরও বেড়েছে। যারা বালু তোলে তারা প্রভাবশালী, তাই অভিযোগ করে কোনো লাভ হয় না।’
স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই বালুমহালের ইজারা নেন এবং নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেন না। প্রশাসন বিষয়টি জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। ফলে বালু উত্তোলনকারীরা কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ মানছেন না। বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হলেও এর ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা আরও বেশি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পরই বালুমহাল ঘোষণা করা হয়েছে। হাইড্রোগ্রাফিক প্রতিবেদনসহ সব বিষয় যাচাই-বাছাই করে ইজারা দেওয়া হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘নদীভাঙন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বালুমহালের কারণে ভাঙন বাড়ে এমন কোনো প্রমাণ নেই। নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। কেউ আইন অমান্য করলে তার ইজারা বাতিল করা হবে।’