স্বপ্নের ইতালি যাওয়া আর হলো না। তার আগেই ভূমধ্যসাগরে ডুবে প্রাণ হারালেন হবিগঞ্জের দুই যুবক। খাবার আর পানির অভাবে নৌকাতেই নিভে গেছে তাদের প্রাণপ্রদীপ। তবুও হাত ছাড়তে চাননি সহযাত্রীরা। নিথর দেহটি তীরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। দিতে চেয়েছিলেন কবর। কিন্তু, তাদের সে চেষ্টা আর সফল হয়ে উঠেনি।
মৃতদেহে পঁচন ধরেছে দেখে শেষ পর্যন্ত বুকে পাথর চাপা দিয়ে প্রিয় সহযাত্রীদের মরদেহ ফেলে দিতে হয়েছে সমুদ্রে। আর সেখানেই হয়েছে তাদের সলিল সমাধি। ৯ দিন ধরে মিলছে না তাদের মরদেহও। সুখের স্বপ্ন দেখা পরিবারগুলো স্বজন হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
নিহত দুই যুবক হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান তালুকদার (৪৫) ও তার ভায়রা ভাই লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া (৪০)।
তারা গত ডিসেম্বরে সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যান। একই নৌকায় তাদের সহযাত্রী বেঁচে যাওয়া সুনামঞ্জের দিরাইয়ের আকমল মিয়া তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বর্তমানে গ্রিসের স্মরনার্থীদের ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।
সেখান থেকে মোবাইল ফোনে তিনি জানান, লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ২১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে একটি নৌকা রওনা দেয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। নৌকার দু্নজন চালক ছিলেন সুদানি নাগরিক। রাতে ২/৩ ঘণ্টা সমুদ্র পথ পাড়ি দেওয়ার পরই চালক রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। ছয়দিন সমুদ্রে নৌকা ভাসতে থাকায় প্রচণ্ড ক্ষুধা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেকেই ভেঙ্গে পড়েন। প্রচণ্ড পানির পিপাসায় বাধ্য হয়ে সমুদ্রের বিষাক্ত পানি পান করছেন অনেকে। পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বমি শুরু হয়। পাশাপাশি গলা দিয়ে রক্ত বের হয়ে নিস্তেজ হয়ে ১৭ জন মারা যান। গত ২৪ মার্চ মারা যান নৌকায় থাকা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান তালুকদার ও তার ভায়রা ভাই লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া। তাদের লাশ একদিন নৌকায় রাখা হয়। আমরা সহযাত্রীদের মরদেহ সমুদ্রে ভাসাতে চাইনি। তাদের কবর দিতে চেয়েছি। একদিন পর নৌকার চালক সুদানীরা মরদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। তারাও চেয়েছিলেন মৃত ১৭ জন ব্যক্তির মরদেহ নৌকায় রেখে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছে বুঝিয়ে দেবেন। কিন্তু লাশে দুর্গদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়াও মরদেহগুলো নৌকায় থাকলে চালকরা বিপদে পড়বে, এ চিন্তা করে তারা মরদেহগুলো সমুদ্রে ফেলে দেন।
লুৎফুর রহমান তালুকদারের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, ‘দালাল সালামের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমার ভাই লুৎফুর রহমান ও তার ভায়রা ভাই জুনাইদ মিয়া ডিসেম্বরে লিবিয়ায় যান। গত ২১ মার্চ আমার ভাই ভাবিকে ফোন করে জানান, তাদের নিয়ে গ্রীসে উদ্দেশ্যে বোটের মাধ্যমে রওয়ানা দেবে। পরবর্তীতে আমরা আর তাদের কোনো সন্ধান পাইনি।
রওয়ানা দেওয়ার দু’দিন দালালের সঙ্গে যোগাযাগ করা হলে তিনি জানান তারা গ্রীসে পৌছেছেন। কিন্তু অদ্যাবধী তাদের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। গত ২৭ মার্চ ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশী বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পারি। এ খবর পাওয়ার পর থেকে আমরা দালাল সালামের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছি। তিনি আত্মগোপন করেছেন বলে জানতে পেরেছি। গত ৬ মে আমরা জানতে পেরেছি ভূমধ্যসাগরে নৌকায় খাবার ও পানির অভাবে আমার ভাই ও তার ভায়রা ভাই প্রাণ হারিয়েছেন। সহযাত্রীরা তাদেরকে সাগরে ফেলে দিয়েছে। আমরা আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতা কামনা করছি।’
সানাবই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য শাহনেওয়াজ জানান, ‘নিখোঁজ লুৎফুর রহমান তালুকদার আমার চাচাত ভাই। লুৎফুর রহমানের সঙ্গে তার শ্যালিকার জামাতাও রয়েছেন। গত ২১ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ইদানিং আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি তারা সেখানে মারা গেছেন। কিন্তু দালালের কোনো সন্ধান পাচ্ছিনা। এ অবস্থায় লুৎফুর রহমানের বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী, তিন সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আমরা অবিলম্বে দালালের গ্রেফতার দাবি করছি।’
করাব ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার দুলাল মিয়া বলেন, ‘জুনাইদ মিয়ার আমার এলাকার। তার ভায়রা ভাইয়ের বাড়ি থেকে খবর পাঠানো হয়েছে সে মারা গেছে।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজের জানান, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। এ রকম শুনেছি। তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারিনি। বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’