বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১২ নং জিউধরা ইউনিয়নের ৯৫ নং বরইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাসির হাওলাদারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও বেতন উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসেও বেতন তুলছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় তার পরিবর্তে ‘সান্টু’ নামে এক ব্যক্তি মাঝে মধ্যে ক্লাস নেন। যদিও তিনি বিদ্যালয়ের কোনো অনুমোদিত শিক্ষক নন। ফলে, পাঠদান কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদ রয়েছে ছয়টি। কিন্তু নিয়মিত উপস্থিত থাকেন মাত্র দুইজন। অনেক সময় একজন শিক্ষক তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে নিয়ে একই কক্ষে পাঠদান করছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৭৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুইজন।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায়ই নিজের ইচ্ছামতো ছুটি নেন এবং কখনও হাজিরা দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে চলে যান।
এদিকে বিদ্যালয় ভবনের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ১৯৭১ সালে নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনের ছাদ থেকে প্লাস্টার খসে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষে ভাঙা চেয়ার-টেবিল পড়ে আছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষেও নেই কোনো চেয়ার। পুরো বিদ্যালয়টি দেখে পরিত্যক্ত ভবনের মতো মনে হয়। খালের পাশের দুইতলা ভবনটিতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কোমলমতি শিশুদের পাঠদান চলছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
স্থানীয় অভিভাবকরা প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের পাঠদান স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আমাদের প্রধান শিক্ষক নাসির হাওলাদার ২০২৬ সালে মাত্র দুই দিন স্কুলে এসেছেন। কিছুদিন তার পরিবর্তে সান্টু নামের একজন ক্লাস নিয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ব। আমরা দ্রুত সমাধান চাই।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াসিফুর রহমান বর্ণ বলেন, ‘স্কুলে নিয়মিত মাত্র দুইজন শিক্ষক থাকেন। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে একসঙ্গে বসতে হয়। আমরা ঠিকভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারি না। প্রধান শিক্ষক আসেন না, আর একজন শিক্ষক এসে হাজিরা দিয়ে চলে যান।’
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির শেখ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকলে সেই স্কুল কীভাবে চলে? আমরা অনেকবার অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাইনি। এক কক্ষে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান হচ্ছে, এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শান্তনা আক্তার বলেন, ‘আমি অল্প কিছুদিন হলো এই স্কুলে যোগ দিয়েছি। প্রধান শিক্ষককে মাত্র দুই দিন দেখেছি। প্রধান শিক্ষক না থাকায় স্কুলের কার্যক্রম নড়বড়ে হয়ে গেছে। ছোটখাটো প্রয়োজনেও তার অনুমতি দরকার হয়। শিক্ষক স্বল্পতা ও জরাজীর্ণ ভবনের কারণে আমরা খুবই সমস্যায় আছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ৯৫ নং বরইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাসির হাওলাদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে কেউ আমার চাকরি খেতে পারেনি, এখন কে চাকরি খাবে।’
তিনি আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। একইভাবে বিএনপি আমলেও শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে উল্লেখ করেন।
এছাড়াও তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রভাব খাটাতে পারবেন বলে আশ্বাস দেন এবং এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পূর্বে এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও পরিচয় দেন।
বিদ্যালয়ের অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার কারণে ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার অজুহাতে নিয়মিত স্কুলে আসা সম্ভব হয় না।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. শেফাইনূর আরেফীন বলেন, ৯৫ নং বরইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত রয়েছেন। ইতোমধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হবে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির বিষয়টি শুনেছি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।