সমাজের মাঝে অদৃশ্য দেওয়ালে যখন আভিজাত্য আর নিম্নবর্গের লড়াই চলে, ঠিক তখনই কোনো কোনো মানুষ সেই দেওয়াল গুঁড়িয়ে দিয়ে মানবিকতার নতুন ব্যাকরণ লেখেন। নজীর গড়েন মানবতার। ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ চণ্ডীদাসের এই কালজয়ী পঙ্ক্তিটি তখন বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। গাজীপুরের হরিজন পল্লীর ধুলোমাখা গলিতে তেমনই এক মানবতার বসন্ত বাতাস নিয়ে হাজির হয়েছিলেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
হরিজন সম্প্রদায়ের মা-হারা এতিম কন্যা প্রীতি রানী বাসফোর। তার বিয়ের উৎসবেই রীতিমত দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া! তার অপ্রত্যাশিত এই উপস্থিতি যেন ওই এলাকায় মূহুর্তেই চাঞ্চল্য ফেলে দেয়! বিয়ের আয়োজকদের কেউ কেউ খুশিতে আত্মহারা হয়ে প্রণাম করতে থাকেন জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত কর্মকর্তাদের। স্থানীয়দের অনেকেই ছুটে আসেন ঘটনা দেখতে। স্থানীয়রা বলতে থাকেন, এ তো রূপকথাকেও হার মানিয়েছে।
রতন বাসফোর একজন সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তারই মেয়ের বিয়ের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ডিসি যখন জয়দেবপুর শহরের এক কোণে আয়োজিত শ্রীমতী প্রীতির বিয়ের অনাড়ম্ভর আসরে পা রাখলেন, তখন পল্লীজুড়ে বয়ে গেল খুশির বন্যা। কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়া বৃদ্ধদের চোখের কোণে ছিল জল, আর মনে ছিল এক আকাশ বিস্ময়। দীর্ঘ বঞ্চনার শিকার এই মানুষগুলো আগে কখনো দেখেনি যে, যাঁদের নির্দেশে শহর পরিষ্কার হয়, সেই শহরের প্রধান অভিভাবক স্বয়ং তাঁদের সাথে এক কাতারে বসে আনন্দের ভাগীদার হতে পারেন।
রতন বাসফোর ও তাঁর প্রয়াত স্ত্রী সীমা রানীর আজীবনের সংগ্রাম ছিল সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা। তাঁদের সেই স্বপ্ন আজ সার্থক, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী প্রীতির বিয়ের আসরে শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, এসেছে আধুনিক বাংলাদেশের এক অনন্য উদারতার বার্তা।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতা আর আভিজাত্যের শিখরে থেকেও সাধারণের সাথে মিশে যাওয়ার এমন বিরল নজির পৃথিবীর নানা প্রান্তে আগেও দেখা গেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাবেক অনেক জনবান্ধব কর্মকর্তা কিংবা বর্তমান সময়ের বেশ কয়েকজন মানবিক ডিসি-ইউএনও-কে দেখা গেছে গৃহহীনদের সাথে ঈদ কাটাতে কিংবা বেদে পল্লীর শিশুদের পাঠদান করতে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের এই উপস্থিতি মূলত আমাদের সংবিধানের সেই মহান আদর্শেরই প্রতিফলন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে সবাই সমান। তিনি কেবল অতিথি হয়ে যাননি, বরং সমাজকে এই বার্তা দিয়ে এসেছেন যে—পেশা কখনো মানুষের পরিচয় হতে পারে না, বরং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই আসল পরিচয়। যে দেশে ভিআইপি সংস্কৃতির আড়ালে সাধারণ মানুষ অনেক সময় জিম্মি হয়ে পড়ে, সেখানে একজন জেলা প্রশাসকের হরিজন পল্লীর দাওয়াত কবুল করা নিছক কোনো লৌকিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে প্রান্তিক মানুষের দূরত্ব কমিয়ে আনার এক সাহসী পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানে ডিসি ছিলেন কনে পক্ষের আমন্ত্রিত অতিথি। কনে শ্রীমতী প্রীতি রানী বাসফোরের বাবা শ্রী রতন বাসফোর বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের গাজীপুর মহানগরের একজন কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উনার স্ত্রী প্রয়াত সীমা রানি বাসফোর গাজীপুরে অবস্থিত ডুয়েটে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা তাদের কন্যা প্রীতি রানি বাসফোরকে শিক্ষিত করেছেন এবং তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
জেলা প্রশাসকের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এলাকাবাসী বলছেন, যখন কোনো উঁচুতলার মানুষ বা জনপ্রতিনিধি সামাজিক মর্যাদায় পিছিয়ে থাকা মানুষের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তখন তা সামাজিক সমতার বার্তা দেয়। এমন ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানবিকতা যখন ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সমাজ ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে সাম্যের আলোয় আলোকিত হতে শুরু করে। প্রীতি রানীর বিয়ের এই মুহূর্তটি তাই কেবল হরিজন পল্লীর ইতিহাস নয়, বরং বাংলাদেশের মানবিক আমলাতন্ত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এই প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক রুল করিম ভূঁইয়া বলেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে রাষ্ট্র সকলকেই সমান ভাবে আসীন করেছে। কাজেই আমরা সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে একত্রে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। গাজীপুরকে একটি সমতা ও ঐক্যের জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে আমরা কাজ করছি। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন আমাদের কর্তব্য, এ বার্তা সমাজের সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কোনো পেশাই অমর্যাদার না, অসম্মানের না, কম গুরুত্বপূর্ণ নয়; এ কথা আমরা বিশ্বাস করতে চাই ও সবাইকে করাতে চাই "।