আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর হাটে এবারও দেখা দিয়েছে নতুন নতুন চমক। কোথাও বিশাল আকৃতির ষাঁড়, কোথাও আবার ব্যতিক্রমী নামের পশু নিয়ে চলছে আলোচনা। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার একটি খামারে এখন মানুষের মুখে মুখে একটাই নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। গোলাপি রঙের বিরল চেহারার এই মহিষটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ভাইরাল হওয়া এক অনন্য গল্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ এর নাম অনুসারে রাখা হয়েছে প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের এই এলবিনো জাতের মহিষটির নাম। তবে শুধু নামই নয়, মহিষটির মাথার সামনের লম্বা লালচে-সোনালি চুলও অনেকের কাছে ট্রাম্পের চুলের স্টাইলের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর সেই মিল থেকেই খামার কর্তৃপক্ষ আদর করে এর নাম দিয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির পশু দেখতে আসা মানুষের বড় একটি অংশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখন এই গোলাপি মহিষ। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ‘নারায়ণগঞ্জের ট্রাম্প’-এর সঙ্গে।
খামারের প্রবেশমুখেই কয়েকজন তরুণকে দেখা যায় ‘ট্রাম্প কোথায়?’ জানতে চাইতে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল দেহের গোলাপি রঙের মহিষটি। সাধারণত বাংলাদেশের মানুষ কালো রঙের মহিষ দেখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু এই মহিষটির শরীরজুড়ে লালচে-গোলাপি আভা, মাথার ওপরে ঘন লম্বা চুল এবং শান্ত রাজকীয় চলাফেরা মুহূর্তেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে।
খামার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার বছর বয়সী এই এলবিনো মহিষটি গত বছরের কোরবানির ঈদের কিছুদিন পর রাজশাহী সিটি পশুর হাট থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস ধরে বিশেষ যত্নে লালন-পালন করা হয়েছে তাকে।
খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা জানান, প্রথম দিকে মহিষটির কোনো নাম রাখা হয়নি। তবে একদিন তার ছোট ভাই মজা করে বলে ওঠেন, এটার চুল তো একদম ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো। এরপর থেকেই মহিষটির নাম হয়ে যায় ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেন, মানুষ সাধারণত কালো মহিষ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এই মহিষটি একেবারেই আলাদা। রং গোলাপি, চুলও অন্যরকম। প্রথম দিন থেকেই সবাই ওকে দেখে অবাক হয়েছে। পরে নামটা ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
খামারের পরিচর্যাকারীরা জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প এর জন্য আলাদা পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় মেনে তাকে খাবার দেওয়া হয়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ভুট্টা, সয়াবিন, খৈল, তিলের খৈল, গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া, খড় এবং তাজা সবুজ ঘাস। শরীরের সুস্থতা ঠিক রাখতে নিয়মিত গোসলও করানো হয়।
পরিচর্যাকারী কাউসার মিয়া বলেন, মহিষটা খুব শান্ত। কেউ বিরক্ত না করলে কখনও আক্রমণ করে না। প্রতিদিন ওকে সময়মতো খাবার দিতে হয়। খাবারের ব্যাপারে একটু নিয়ম মেনে চলতে হয়। ওর যত্নও অন্যগুলোর চেয়ে বেশি।
আরেক রাখাল জুবায়ের বলেন, খামারে আরও অনেক পশুর মজার নাম রয়েছে। যেমন— তুফান, রহমান ডাকাত, মাস্তান। তবে সব নামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনেকে শুধু এই মহিষটা দেখতেই আসে। ছবি তুলে নিয়ে যায়। ছোট বাচ্চারা খুব পছন্দ করে।
খামারে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেসবুকে দেখে বিশ্বাস হয়নি। পরে নিজে এসে দেখি সত্যিই মহিষটার চুল ট্রাম্পের মতো। তাই দেখতে এলাম।’
আরেক দর্শনার্থী বিথি আক্তার বলেন, ‘এত সুন্দর মহিষ আমি আগে দেখিনি। গোলাপি রং হওয়ায় দূর থেকেই আলাদা লাগে। নামটাও খুব মানিয়েছে।’
শহরের আরেক বাসিন্দা মাহমুদুল দিপু বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর কৌতূহল থেকে দেখতে এসেছি। সামনে থেকে দেখে মনে হয়েছে, সত্যিই নামটা ঠিক দেওয়া হয়েছে।
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ আবার বাচ্চাদের নিয়ে খামারে আসছেন। অনেক পরিবারই এটিকে এখন এক ধরনের বিনোদনের অংশ হিসেবে দেখছেন। ঈদকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশু দেখতে আসার পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ভাইরাল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক নজর দেখার আগ্রহ।
খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তাদের খামারে প্রায় ২০০টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। বিভিন্ন দামের পশু রাখা হয়েছিল ক্রেতাদের সামর্থ্য অনুযায়ী। ৭০ হাজার টাকা দামের গরু যেমন ছিল, তেমনি ছিল বড় আকৃতির উচ্চমূল্যের পশুও। যাদের বাজেট কম, তাদের জন্য রাখা হয়েছিল ভেড়া ও ছোট আকারের পশু।
তবে খামারের সব পশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিনই খামারে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।
খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা বলেন, ‘আমরা কল্পনাও করিনি যে এত মানুষ আসবে। ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিন শত শত মানুষ শুধু ট্রাম্পকে দেখতে আসছে।’