কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে গরু চুরির ঘটনা। সংঘবদ্ধ চক্র গভীর রাতে খামারে হানা দিয়ে একের পর এক গরু চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই এলাকার প্রান্তিক খামারি ও কৃষকেরা।
চুরি ঠেকাতে এখন গ্রামেগঞ্জে চলছে রাতভর পাহারা। বাঁশি, লাইট ও লাঠি হাতে স্থানীয়রা টহল দিচ্ছেন এলাকাজুড়ে। আর কোনো সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখলেই বাজানো হচ্ছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী ‘বাঁশকল’। মুহূর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন গ্রামবাসী। স্থানীয়দের কাছে এখন বাঁশকলের শব্দ মানেই সতর্ক সংকেত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও সলঙ্গাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক গরু চুরির ঘটনা ঘটছে। গত ৫ মে গভীর রাতে কামারখন্দ উপজেলার বড়কুড়া মালোপাড়া, ছোট কুড়া ও নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে এক রাতেই নয়টি গরু চুরি হয়। এরপর থেকেই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া গত ১০ মে গভীর রাতে উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্বরামকৃষ্ণপুর গ্রামে খামারি ময়নুল ইসলামের খামারে হানা দেয় সংঘবদ্ধ চোরচক্র। খামারির অভিযোগ, প্রায় ১০ জনের একটি দল মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আসে এবং খামার থেকে ছয়টি গরু নিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি খামারের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে।
খামারিদের অভিযোগ, গভীর রাতে বিশেষ কৌশলে গোয়ালঘর থেকে গরু বের করে দ্রুত ট্রাকে তুলে এলাকা ত্যাগ করছে চোরচক্র। তাদের দাবি, গত দুই মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় অর্ধশত গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে।
গরু চুরির শিকার কামারখন্দের খামারি রুহুল আমিন জানান, তার খামার থেকে দুটি গাভী, একটি বকনা গরু ও একটি কোরবানির ষাঁড় চুরি হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আরেক কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, একটি গাভী, একটি বাছুর ও একটি বকনা গরু চুরি হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এদিকে গরু চুরি ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দা, খামারি, গ্রাম পুলিশ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। পালাক্রমে চলছে রাতভর পাহারা।
সলঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, প্রতিদিন রাত ১০টার পর থেকে বাঁশি, লাইট ও লাঠি নিয়ে গ্রামে গ্রামে টহল দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
উল্লাপাড়ার খামারি নাজমুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদ পর্যন্ত এই পাহারা চলবে। সব খামারিই পর্যায়ক্রমে নিরাপত্তা টহলে অংশ নিচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, জনগণের সহযোগিতা ছাড়া অপরাধ দমন সম্ভব নয়। কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কোরবানির ঈদের জন্য সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় ৬ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। আর তাই গরু চুরির বাড়তি উৎপাত খামারিদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘বাঁশকল’ এখন শুধু একটি সংকেত নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের ঐক্য, সচেতনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।