পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় এমন একটি লিচু বাগান রয়েছে যেখানে নিজের ইচ্ছে মতো ঘুরবেন, লিচু খাবেন এবং স্বজনদের জন্য নিয়ে যাবেন। আর এ জন্য আপনাকে গুনতে হবে না কোনো টাকা।
এমনই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম। উপজেলার আলোকদিয়ার গ্রামে ৮ বিঘা জমির ওপর বাগান তৈরি করেছেন তিনি। সেখানে ২০০ এর অধিক গাছে রয়েছে নানা জাতের লিচু। এই লিচু মানুষ, পশু-পাখি সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন এই বাগানে। তারা লিচু খাচ্ছেন আবার বাড়িতেও নিয়ে যাচ্ছেন। পুরো জেলায় এখন আলোচনার শীর্ষে রয়েছে শামীমের এই বাগান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় যুগ আগে তিনি নিজেদের জমিতে এই লিচুর বাগান করেন। লিচু বাগানের ২০০ এর অধিক গাছে থোকায় থোকায় নানা জাতের লিচুতে পরিপূর্ণতা পায়। খাবার উপযোগী হলেই স্থানীয় গ্রামবাসী, আশপাশের লোকজন, দরিদ্র, হতদরিদ্র, বন্ধু-বান্ধব স্বজনেরা এসে ইচ্ছেমতো বিনা পয়সায় এই লিচু খেতে পারেন। নিজ হাতে লিচু পেড়ে খাওয়া এ যেন এক বিনোদনের আয়োজন। এই বাগানের লিচু কোনদিন বিক্রি করা হয়নি। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি যেন এই লিচু খেতে পারে এ জন্য বাগান করা হয়েছে উন্মুক্ত। নেই কোন বাউন্ডারি ওয়াল, সীমানা প্রাচীর বা কাটা তারের বেড়া। খাচা বা নেট ব্যবহার একেবারেই নেই।
বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষক আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘সম্প্রতি ফেসবুকে বিষয়টি দেখতে পাই। তারপরই ছুটে এসেছি স্বচক্ষে এমন উদ্যোগ দেখার জন্য। আমি দেখে মুগ্ধ। আসলে মানুষের জন্য কিছু করার সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। যার জলন্ত উদাহরণ কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জামাল শামীম।’
পাভেল মৃধা নামের এক দর্শণার্থী বলেন, ‘মানুষ ইচ্ছে করলেই মানবিক, উদার আর জনবান্ধব হতে পারেন। বর্তমানে কেউ কাউকে ছাড় দেন না। সেখানে বাণিজ্যিক যুগে এসে নিজ খরচে ২০০ গাছের লিচু বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা কম কথা নয়। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রাজু আহমেদ বলেন, ‘ভালো কাজ করে গ্রামকে সবার কাছে আলোচিত করতে একজনই যথেষ্ট। যার উদাহরণ আমাদের গ্রামের কৃতি সন্তান শামীম। তার এই মহতি উদ্যোগের কারণে গ্রামের অনেক মানুষকে বাজার থেকে লিচু কিনে খেতে হয় না। যাদের লিচু খাওয়ার ইচ্ছে হয় তারা যে কোনো সময়ে লিচু খেতে বাগানে চলে আসেন। বাগানে আসতে কোন দরজা পেরুতে হয় না। কারও অনুমতিও লাগে না।’
জানা গেছে, বাগানের মালিক কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম একজন ব্যবসায়ী। তিনি পাবনা শহরের স্বাস্থসেবা প্রতিষ্ঠান কিমিয়া সেন্টারের স্বত্তাধিকারী। চিকিৎসা সেবা, শিক্ষাবৃত্তি, মেধাবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ, কিডনী ও হার্টের চিকিৎসা সেবা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি এক নামে খ্যাতি কুঁড়িয়েছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি শহরের প্রাণ কেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা কলেজ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতাও করছেন।
বাগানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নাগরিক প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপ হয় মোস্তফা জামাল শামীমের। তিনি বলেন, ‘গ্রামের মানুষের পাশাপাশি ছোট্ট শিশুদের খুশি করতেই এই উদ্যোগ। যেন বাচ্চারা আনন্দের সঙ্গে নিজে হাতে লিচু পেড়ে খেতে পারে। আমি সব সময় বাগানে বা গ্রামে থাকি না। কিন্তু যখন শুনি বাগানে নানা শ্রেণির মানুষ দল বেধে এসে লিচু পেড়ে খাচ্ছেন, শুনেই তৃপ্তি পাই। ভালো লাগে।’
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এমন উদ্যোগ সচরাচর কোথাও দেখা যায় না। বাগান মালিককে এমন একটি ভাল কাজ করার জন্য স্বাগত জানাই। অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, যাদের ইচ্ছে থাকলেও সামর্থ্য না থাকায় লিচু খাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। তাই দেশের আরও যারা লিচু বাগান মালিক আছেন, তারা যদি এমন উদারতা দেখান, তাহলে সমাজের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবেন।’