শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মহাসড়কে মিছিলের প্রস্তুতির খবর পেয়ে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে অভিযানের সময় মিছিলের প্রস্তুতিতে থাকা ব্যক্তিরা পালিয়ে গেলেও পরে সড়কে চলাচলকারী নিরীহ পথচারীদের আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে জাজিরা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, আটক ব্যক্তিদের খোঁজ নিতে থানায় গেলে সেখান থেকেও আরও দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। শনিবার (২৩ মে) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জাজিরা থানা পুলিশ।
এর আগে শুক্রবার (২২ মে) দুপুরের দিকে ঢাকা শরীয়তপুর মহাসড়কের জাজিরা কলেজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবার দাবি করছে, তাদের স্বজনদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে নিরপরাধ কেউ থাকলে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, শুক্রবার দুপুরে জাজিরা থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, জাজিরা কলেজ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী মহাসড়কে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মিছিলের প্রস্তুতিতে থাকা ব্যক্তিরা দৌড়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকা থেকে কয়েকজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই মিছিলে অংশ নিতে আসেনি। তারা কেউ মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন, কেউ আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন, আবার কেউ কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। প্রকৃত অভিযুক্তদের ধরতে না পেরে সাধারণ পথচারীদের আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে ছয়জনকে আটক করা হয়। পরে আরও দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় জাজিরা থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) হিমায়েত হোসেন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরে আটক আটজনকে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। শনিবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন-নড়িয়া উপজেলার ডগ্রী মোচেন ঢালী কান্দি এলাকার আর্শেদ আলী সরদারের ছেলে মো. আতাহার সরদার (২৬), জাজিরা উপজেলার মোল্লাকান্দি এলাকার চুন্নু মাদবরের ছেলে তুলন মাদবর (১৯), নড়িয়া উপজেলার ডগ্রী মোচেন ঢালী কান্দি এলাকার আমির হোসেনের ছেলে মোঃ নাহিদ হাসান সরদার (২২), জাজিরা উপজেলার দক্ষিণ ডুবলদিয়া এলাকার বিল্লাল শিকারীর ছেলে শাকিল শিকারী (২০), জাজিরার বালিয়াকান্দি এলাকার দানেশ শেখের ছেলে জয় শেখ (২৬), শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিকন্দী এলাকার খোকন খানের ছেলে লিয়াকত খান (২১), জাজিরা উপজেলার গজনাইপুর এলাকার টিটন মোল্লার ছেলে রিফাত মোল্লা (২০) এবং নড়িয়া উপজেলার নয়ন মাদবর কান্দি এলাকার মজিবর সরদারের ছেলে সাব্বির সরদার (২৪)।
আটক হওয়া শাকিল শিকারীর বাবা বিল্লাল শিকারী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলে রুপবাবুরহাটে একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করে। শুক্রবার দুপুরে দোকান থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে তার চাচাতো বোনকে দিতে জাজিরা কলেজ এলাকার চাচার বাড়িতে যায়। পরে সেখান থেকে ফেরার সময় পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। সে শুধু নিজের কাজ নিয়েই থাকে। নিরীহ ছেলেকে এমন মামলায় জড়ানো হয়েছে।’
গ্রেফতার হওয়া আতাহার সরদারের বোন ফারজানা বলেন, ‘আমার ভাই আতাহার, সাব্বির সরদার ও নাহিদ সরদার দিনমজুরের কাজ করে। শুক্রবার তারা একটি মোটরসাইকেলে করে জাজিরার সেনেরচর এলাকায় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে মোবাইল নিয়ে বাড়িতে ফিরছিল। পথে জাজিরা বটতলা এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ তাদের আটক করে নিয়ে যায়।’
গ্রেফতার হওয়া নাহিদ হাসানের বাবা আমির হোসেন সরদার বলেন, ‘আমরা খুব সাধারণ মানুষ। আমার ছেলে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে দিনমজুরি খায়। সে বন্ধুদের নিয়ে আমার শ্বশুরবাড়ি সেনেরচর থেকে বাড়ি ফিরছিল। বটতলা এলাকায় পৌঁছানোর পর পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে থানায় গিয়ে শুনি, তাদের নাকি আওয়ামী লীগের মিছিল করতে যাওয়ার অভিযোগে আটক করা হয়েছে। অথচ আমার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নয়। পুরো এলাকাবাসী সেটা জানে। নিরপরাধ ছেলেদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
এছাড়াও আটক অন্যদের স্বজনরাও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের সন্তানদের গুরুতর মামলার আসামি করা হয়েছে। অনেক পরিবারই এ ঘটনায় আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
এ বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনকে আটক করা হয় এবং পরে আরও দুইজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।’
পথচারীদের আটক করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে তাদের আটক করা হয়েছে। তদন্ত শেষে যদি কেউ নিরপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’