কোরবানির ঈদ সামনে এলেই একসময় জমে উঠত বগুড়ার চামড়ার আড়ত। জেলা সদর থেকে শেরপুর, ধুনট, কাহালু কিংবা সারিয়াকান্দি—সবখানেই মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ত। কিন্তু, এবার সেই চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা, বাড়তি লবণের খরচ, নতুন পুঁজির সংকট এবং বাজার অনিশ্চয়তায় চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন জেলার ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নগদ অর্থ দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করলেও ঢাকার ট্যানারিগুলোতে সেই চামড়া বিক্রি করতে হয় বাকিতে। বছরের পর বছর ঘুরেও মেলে না পাওনা টাকা। বরং পুরোনো বকেয়ার সঙ্গে নতুন দেনা যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে, অনেক ব্যবসায়ী চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে রিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা প্রহরীর চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলার ব্যবসায়ীদের কাছে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্যানারি মালিকদের বকেয়া এখন প্রায় ৩২ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে আগের প্রায় ২২ কোটি টাকা পরিশোধ না করেই নতুন করে আরও প্রায় ১০ কোটি টাকা বকেয়া ফেলেছে ট্যানারিগুলো।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই বছর ধরে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে কার্যকর কোনো ফল আসেনি। বরং প্রতিবারই নতুন করে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। ফলে, নতুন মৌসুমে চামড়া কেনার পুঁজি হারিয়ে ফেলছেন অনেকে।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত কয়েকজন আড়তদার বলেন, আগে ঈদের সময় কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে চামড়া কিনতেন। কিন্তু, এখন সেই সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, ট্যানারিগুলো সময়মতো টাকা দেয় না। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ মিটিয়ে শেষে লোকসান গুনতে হয়।
এদিকে সরকার ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে রাজধানীর বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, দাম বাড়লেও বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ লবণের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচও বেড়েছে। আগে প্রতি বস্তা লবণ ৭০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৭৪ কেজির একটি বস্তা কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৯০০ টাকা। একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়া সংরক্ষণে গড়ে ৮ থেকে ১০ কেজি লবণ লাগে। ফলে, প্রতি চামড়ায় অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ টাকা খরচ বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, সরকারিভাবে এতিমখানা, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে লবণ সহায়তা দেওয়া হলেও আড়তদারদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। অথচ জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন এসব আড়তদাররাই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বগুড়ায় এবার কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রায় তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার মেট্রিক টন লবণের প্রয়োজন হতে পারে। একটি গরুর চামড়ায় ৭ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগল বা ভেড়ার চামড়ায় দেড় থেকে দুই কেজি লবণ প্রয়োজন হয়।
বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘জেলায় প্রতিবছরই কোটি কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়। কিন্তু, চামড়ার দাম কম হওয়া এবং লবণযুক্ত চামড়ায় নানা ত্রুটি দেখিয়ে ট্যানারি মালিকেরা বছরের পর বছর আমাদের টাকা আটকে রাখছেন। এতে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ পুঁজিসংকটে পড়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে বর্তমানে আমাদের প্রায় ৩২ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়েও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।’
তিনি আরও জানান, জেলার সবচেয়ে বড় চামড়ার বাজার জেলা সদর ও শেরপুর উপজেলায়। শুধু শেরপুরেই প্রতিবছর প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়। সবমিলিয়ে জেলায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার চামড়ার বাণিজ্য হয়ে থাকে। তবে প্রায় ৫০ শতাংশ চামড়া মানসম্মত না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
অন্যদিকে কোরবানির পশুর চামড়া কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। এই অর্থ দিয়েই বছরজুড়ে এতিম ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের খাবার, আবাসন ও শিক্ষার ব্যয় চালানো হয়। জেলার ১২ উপজেলার ১৩৭টি এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ইতোমধ্যে ৯০ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেলে এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
চামড়া সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘পৌরসভাকে কোরবানির দিনই বর্জ্য অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চামড়া সংরক্ষণে কর্মশালা করা হয়েছে, লবণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া পাচার রোধে কমিটি গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’
জেলা বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান জানান, ‘ঈদুল আজহায় চামড়া সংগ্রহ ও কেনাবেচার অন্যতম বড় বাজার বগুড়া। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ১৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে ৯০ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। সরকারিভাবে চামড়ার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার বাজারে ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।’
তবে মাঠের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু দাম ঘোষণা করলেই হবে না; ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা বকেয়া আদায় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা না করলে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্প আরও সংকটে পড়বে।