‘ঈদের দিন সারা দিন কানতাম। কাউরে বুঝতে দিতাম না আরকি। বড় সন্তান ছিল না। অনেক কষ্টে ঈদের দিনটা কাটত।’ মুঠোফোনে কথাগুলো বলছিলেন শিশু সাইদুলের (১২) বাবা মোস্তফা কামাল। সাইদুলের মা-বাবা থাকেন চট্টগ্রামে। সাইদুল হারিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো ঈদে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনায় যাননি তারা। তবে এবার গ্রামের বাড়িতে ঈদ করবে পরিবারটি।
সাইদুলের মা ফাতেমা আক্তার বলছিলেন, ‘ও (সাইদুল) তো দাদা-দাদির খুব ভক্ত। ওর জন্যই আগেভাগে যাওয়া হতো। হারানোর পর আর যাইনি। ভালো লাগত না।’
গত ১৩ এপ্রিল ‘বাড়ি ফিরতে চায় সাইদুল’ শিরোনামে একটি দৈনিকের ফেসবুক পেজ থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। সেই পোস্টের সূত্র ধরে পাঁচ বছর পর মা-বাবার কাছে ফেরে এই কিশোর।
গত সোমবার মুঠোফোনে একাধিকবার সাইদুল ও তার মা-বাবার সঙ্গে কথা হয়। পাঁচ বছর পর পুরো পরিবার নিয়ে ঈদ করতে গ্রামে যাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করেন সবাই।
মুঠোফোনে সাইদুলের উচ্ছ্বাস টের পাওয়া যাচ্ছিল। ‘কেমন আছ?’ সাইদুলের তাৎক্ষণিক জবাব, ‘অনেক ভালো, ভাই। আপনাদের কথা মনে পড়ে।’ ঈদে দাদা-দাদির কাছে ফিরতে উদগ্রীব সাইদুল। মুঠোফোনে দাদার কেনা কোরবানির গরু দেখেছে সে। ‘ঈদের দিন কী করবে?’ সাইদুল বলে, ‘ঈদের দিন বাবার সঙ্গে নামাজে যাব। দাদাও যাবে, সবাই একসঙ্গে।’
সাইদুলের ফুফুরা ওকে জানিয়েছেন, নতুন পোশাক কিনে রেখেছেন তারা। ঈদের দিন সেটা পরবে সাইদুল।
চট্টগ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে কোরবানির হাটে ঘুরেছে সাইদুল। প্রতিবেশীরা গরু কিনে দেখতে ডাক দেন। আনন্দ নিয়ে গরু দেখে বেড়ায় সে। প্রতিবেশী চাচা মোস্তফা হাট থেকে গরু এনে বলেছেন, ‘সাইদুল, গরু আনছি। গরুর সঙ্গে থাকবা, গোসল করাবা। এটা তোমারই গরু।’
আগের ঈদগুলোর স্মৃতি ভোলেনি সাইদুল। স্মৃতি হাতড়ে বলল, ‘ওই সময় মনে অনেক কষ্ট হইতো। তখন রাস্তায় থাকতাম। সবাই হয়তো ভাবত, আমি বাঁইচা নাই।’
সাইদুলের বাবা অসুস্থ থাকায় খুব একটা কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমার আর বড় কিছু পাওয়ার নাই। ছেলেরে নিয়া ঈদ করব। এইটাই অনেক কিছু। অনেক খুশি।’
সাইদুলের মা ফাতেমা বলছিলেন, ‘আমাদের প্রতিবছর আশা থাকত, ছেলেরে পাব হয়তো। ওর সঙ্গে ঈদ করতে পারব। এটা করতে করতে কতগুলা বছর পার হইলো। এত বছর পর ওরে পাইছি। ওর সঙ্গে ঈদ করব। কী যে ভালো লাগতেছে!’
২০২১ সালে চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে যায় সাইদুল। তখন তার বয়স ছিল সাত। সে ট্রেনে ঢাকায় চলে এসেছিল। পাঁচ বছর ঢাকার রাস্তায় কাটানোর পর গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পরিবারের কাছে ফিরে যায় সে।
ফাতেমা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্য সে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। ফাতেমা বলেন, সাইদুলের বাবা সারা দিন বাইরে থাকেন। ছোট ভাই থাকে মাদ্রাসায়। বাসায় সাইদুলকে একা থাকতে হয়। তাই কাজ ছেড়েছেন তিনি।
তবে ফাতেমা কাজ ছাড়ায় সংসারে টানাটানি দেখা দিয়েছে তাদের। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং ছোট ছেলের মাদ্রাসার বেতনের কিছু টাকা বাকি পড়েছে। ফাতেমা বলেন, সাইদুল যখন গ্রামে দাদা-দাদির সঙ্গে থাকবে, তখন আবার কাজ শুরু করবেন তিনি।
সাইদুলকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তেমন কোনো সমস্যা নেই ওর। শুধু পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। মা-বাবা সে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ফাতেমা বলছিলেন, সাইদুলকে নিয়মিত ডিম-দুধ-ফল খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন তারা।