ঝালকাঠি সদর উপজেলার শেখেরহাট ইউনিয়নের সীমান্তকাঠি এলাকার ঘন সবুজে ঘেরা একটি নির্জন জঙ্গল। পাখির ডাক আর গাছের পাতার শব্দ ছাড়া সেখানে তেমন কোনো কোলাহল নেই। সেই জঙ্গলের ভেতরেই নিজের হাতে তৈরি ছোট্ট একটি আশ্রয়ে বছরের পর বছর বসবাস করছেন ৩৮ বছর বয়সী পলাশ বড়াল। মানুষের ভিড় থেকে দূরে, প্রকৃতিকেই তিনি করেছেন নিজের সঙ্গী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীমান্তকাঠি এলাকার কৃষক ধীরেন বড়ালের ছেলে পলাশ। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে পলাশ তৃতীয়। তরুণ বয়সে পাশের গ্রামের এক তরুণীর প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল পলাশের। সাহস করে ভালোবাসার কথা জানালেও সাড়া মেলেনি। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। একসময় সংসার, সমাজ ছেড়ে জঙ্গলে একাকী জীবন বেছে নেন।
পরিবারের সদস্যরা তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে একসময় বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু জঙ্গলে বসবাসের অভ্যাস বদলাতে পারেননি পলাশ। সংসার টেকেনি। বিয়ের প্রায় এক বছরের মধ্যেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আর সমাজে ফেরার চেষ্টা করেননি তিনি।
সরজেমিনে গিয়ে দেখা যায়, জঙ্গলের ভেতরেই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি ছোট্ট আশ্রয় গড়ে তুলেছেন পলাশ। সেখানেই কাটছে তার দিন-রাত। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই যেন এখন তার জীবনের একমাত্র বাস্তবতা।
পলাশ বড়াল বলেন, ‘পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই জঙ্গল জীবন বেছে নিয়েছি। কেউ স্বেচ্ছায় এমন জীবন বেছে নিতে চায় না। আমি প্রতারিত হইনি, নিজের ব্যর্থতার কারণেই এখানে চলে এসেছি।’
এলাকাবাসী মনে করেন, পলাশের জীবনের গল্পটি শুধু একজন মানুষের একাকীত্বের গল্প নয় এটি মানসিক আঘাত, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি।
পলাশের বড় ভাই বিনয় বড়াল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘পলাশ ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের ছিল। এইচএসসি পাস করার পরে সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও নিয়েছিল। ২০১৫ সালের পর কিছু ব্যক্তিগত হতাশার পর সে ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেয়। আমরা অনেকবার তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। বিয়ের ব্যবস্থাও করেছিলাম, কিন্তু সে জঙ্গলের জীবন ছেড়ে আর ফিরে আসতে পারেনি। এখনও আমরা চাই, সে পরিবারের কাছে ফিরে আসুক এবং স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করুক।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিকাশ হালদার বলেন, ‘পলাশের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। এলাকার মানুষ তাকে চেনে এবং অনেকেই বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। আমরা চাই, পলাশ আবার সমাজের মূলধারায় ফিরে আসুক।’