বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী ১৬ জুলাই থেকে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সানিউল ফেরদৌস। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
ডিসি বলেন, ‘জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা পর্যটন খাতের ওপর নির্ভরশীল। টানা কয়েকদিন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই ১৫ জুলাইয়ের পর নতুন করে বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ দেখা না দিলে ১৬ জুলাই থেকেই পর্যটকদের জন্য সব পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সাম্প্রতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে যেকোনো দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’
প্রসঙ্গত, টানা ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির কারণে পর্যটক এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তার স্বার্থে ৮ থেকে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বন্যা পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে ডিসি জানান, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল মাত্র দুই মিলিমিটার। বর্তমানে সাংগু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫.৪৮ মিটার ও মাতামুহুরী নদীর পানি ৩.৭১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে দুটি নদীর পানিই বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠেছিল।
তিনি জানান, বন্যা ও ভারি বর্ষণে জেলায় ৪৭টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে, যার মধ্যে ১১টি বড় ধরনের। পাহাড়ধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার যৌথ উদ্যোগে সব সড়ক সচল করা হয়েছে। দুর্যোগে লামা উপজেলায় পাহাড়ধসে পাঁচ ও পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬১ কিলোমিটার ও এলজিইডির ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চারটি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি সচল করা হয়েছে ও বাকি তিনটির মেরামতকাজ চলমান রয়েছে।
জেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ভবন ও নির্মাণাধীন স্থাপনাতেও অনেক পরিবার অবস্থান করছে। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুই হাজার ৫৮২ জন রয়েছেন এবং ১২ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লামা পৌর এলাকা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলা। জেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা, পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এসব সহায়তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, আনসার, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, বিএনপির নেতাকর্মী এবং ব্র্যাক, গ্রাউস, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ত্রাণ কার্যক্রমে একযোগে কাজ করছে।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষে দুর্যোগকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক ভবিষ্যতেও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।