নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট আজম খানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
কলেজের পরিচালনা কমিটির অনুমোদন ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিবর্তনের চেষ্টা, রাতের আঁধারে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তদারকি এবং কলেজ পরিচালনা কমিটির কারো কোনো মতামত না নিয়ে কলেজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নাম ঘোষণাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে আজম খানের বিরুদ্ধে।
কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ শাদী, গভর্নিং বডির সদস্য সাইফুল্লাহ সোহাগসহ আরও দুই সদস্য এই অভিযোগ করেছেন।
সাইফুল্লাহ সোহাগের অভিযোগ, কলেজের পরিচালনা কমিটিতে ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অ্যাডভোকেট আজম খান গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অন্য সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি গভর্নিং বডির সভায় সভাপতি নিজের প্রস্তাবই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দিতে চান। সদস্যদের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে তিনি সরাসরি রেজুলেশন করতে বলেন।’
সাইফুল্লাহ সোহাগের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ জুন অনুষ্ঠিত গভর্নিং বডির সভায় কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ শাদীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শাহ আলামকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার প্রস্তাব দেন সভাপতি। উপস্থিত সদস্যরা ওই প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনার অনুরোধ জানান। এ নিয়ে একপর্যায়ে সভাপতির সঙ্গে সদস্যদের বাগবিতণ্ডা হয় এবং তিনি সভা ত্যাগ করেন।
অভিযোগকারী জানান, বিষয়টি জটিল হয়ে উঠলে গভর্নিং বডির কয়েকজন সদস্য নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলামের নজরে আনেন। বিষয়টি শুনে তিনি পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে আইনানুগ সমাধানের আশ্বাস দেন।
তবে এর মধ্যেই গত ৭ জুলাই আজম খান বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ শাদীকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেন। তাকে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে শাহ আলামকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
শেখ শাদী পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া দায়িত্ব ছাড়তে রাজি হননি বলে জানান অভিযোগকারীরা। তারা জানান, ৭ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টার দিকে কলেজের অফিস সহকারী ও নৈশপ্রহরীর সহযোগিতায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কক্ষ খোলা হয়। অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়াই সেখানে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি, ফাইল ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়।
এ সময় অধ্যক্ষের সরকারি সিল ও প্যাড ব্যবহার করে শেখ শাদীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং শাহ আলামকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
পরে কলেজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে শাহ আলামকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, পরিচালনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
গভর্নিং বডির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া রাতে তার কক্ষ খোলা এবং দাপ্তরিক নথিপত্রে হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
আরেক সদস্য কবির আহমদ বলেন, ‘যখন বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্য সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন, তখন তার আগেই এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া পরিচালনা কমিটির নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন সদস্য হিসেবে আমি এতে বিব্রত।’
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ শাদী বলেন, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া দায়িত্ব ছাড়তে তিনি রাজি হননি। এরপর তার অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিমালা এবং গভর্নিং বডির অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা প্রয়োজন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া দায়িত্ব পরিবর্তন করা হলে তা প্রশাসনিক ও আইনগত প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মকর্তার দাপ্তরিক কক্ষে প্রবেশ, সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে অননুমোদিত হস্তক্ষেপ কিংবা সিল-প্যাড ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট আজম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পারে নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।