আশির দশকে নির্মিত টার্মিনালে চলছে টাঙ্গাইলের বাস সেবা। বিগত এক যুগ আগে পৌর কর্তৃপক্ষ বাস টার্মিনালের সমিতির ভবন ও যাত্রী ছাউনি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। সেই পরিত্যক্ত ভবনে এখনও চলছে যাত্রীসেবা। গত তিন বছর আগে প্রায় পাঁচ একর সরকারি জমি বরাদ্দ পেলেও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি আধুনিক বাস টার্মিনালের। বর্তমানে টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালে যানবাহনের সংখ্যা অনেক, জায়গা সংকটের কারণে যানবাহনের চাপে রাস্তা বন্ধ হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এই কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক পথচারীদের।
রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা টাঙ্গাইল। আয়তনের দিক থেকে ঢাকা বিভাগের সর্ববৃহৎ জেলা এবং জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। টাঙ্গাইলকে ‘উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার’ বলা হয়, কারণ ঢাকা বিভাগের একটি অংশ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার যানবাহন দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়। টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে, যা এটিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
কিন্তু টাঙ্গাইলে নেই কোনো আধুনিক বাস টার্মিনাল। নতুন বাস টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইল পৌরসভার দেওলা ও কোদালিয়া এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে ৮০ দশকে। সময়ের ব্যবধানে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। হাজার হাজার মানুষ তাদের গন্তব্যে রওনা দেয় এই বাস টার্মিনাল থেকে। এই নতুন বাস টার্মিনালের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা সংকট থাকার কারণে সবসময় যানযট লেগেই থাকে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজন কর্মের উদ্দেশ্যে আসে জেলা শহরে।
টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের পাশেই রয়েছে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল এবং টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে বড় সংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে এখানে। নতুন বাস টার্মিনালে প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকার কারনে রোগীদের যাতায়াত করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গত ২০২২ সালের ৪ জুলাই এক লাখ এক টাকা মূল্যে টাঙ্গাইল পৌরসভা ৩০ বছর মেয়াদী ৪.৯৪ একর সরকারি জমি লিজ পায় আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য। জায়গাটি রাবনা বাইপাসের পাশেই অবস্থিত। কিন্তু দীর্ঘদিন হলেও এখনও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি।
টাঙ্গাইল জেলা বাস-কোচ-মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন জানান, মালিক সমিতির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৮০০ গাড়ি। প্রতিদিন ৩৫০-৪০০ গাড়ি চলে জেলা শহরের বাস টার্মিনাল থেকে, বাকি ৪০০ গাড়ি চলে বিভিন্ন উপজেলা টার্মিনাল থেকে। এছাড়াও ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যটারি-চালিত ইজিবাইকের আলাদা স্ট্যান্ড না থাকায় বাস টার্মিনালেই এসব যানবাহনের স্ট্যান্ড হিসেবেও রূপ নিয়েছে। ফলে দিন দিন জায়গা সংকট হয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
টাঙ্গাইল জেলা বাস-কোচ- মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম লাভলু জানান, গত ১০ বছর আগে পৌরসভা থেকে এই বাস টার্মিনাল পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এরপর বাস টার্মিনালের মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন এবং যাত্রী ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত ভবনটি সংস্কার করা হয়নি। জেলার যানবাহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মালিক, শ্রমিক সবারই কাম্য আধুনিক বাস টার্মিনাল।
মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ইউসুফ আলী মিয়া (তরুন ইউসুফ) জানান, তার বাসা টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের পাশেই। প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসার সময় বাস টার্মিনালের রাস্তায় যানজটের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৪০ মিনিট সময় বেশি লাগে কলেজে পৌঁছাতে। এছাড়াও বাস টার্মিনালের কাছে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল এবং টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় বাস টার্মিনালের এই যানজটের কারণে।
তিনি আরও জানান, যানজটের কারণে ডেলিভারি রোগী বাস টার্মিনালেই বাচ্চা প্রসব করার ঘটনাও ঘটেছে। বাস টার্মিনালের আশেপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ নিতে যাওয়ার সময়ও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় এই যানজটের কারণে। আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে যানবাহন চলাচল করলে এই যানজটের নিরসন হবে এবং পথচারীদের ভোগান্তি লাঘব হবে বলে মনে করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পথচারী জানান, বাস টার্মিনালে এমনিতেই জায়গা সংকট, এখানে বাস রাখার পাশাপাশি অন্যান্য যানবাহনের স্ট্যান্ডও হয়েছে। এছাড়াও বাস টার্মিনালের উত্তর পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে কাঁচা বাজার। দোকানগুলো প্রায় রাস্তার উপরেই বসেছে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানির মতো ঘটনাও। অতি দ্রুত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই কাঁচা বাজার অপসারণ করার দাবি পথাচারীসহ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার টাঙ্গাইলের উপ-পরিচালক মো. শিহাব রায়হান জানান, আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য টাঙ্গাইল পৌরসভার অনুকূলে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া জমিতে মাটি ভরাট করার জন্য টেন্ডার হয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুতই মাটি ভরাট করে বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।