লালমনিরহাটের বত্রিশহাজারী গ্রামের কৃষক লোকমান হোসেন চলতি মৌসুমে তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। প্রতি একরে গড়ে ৯ হাজার কেজি পেয়ে তিনি খুশি হলেও বাজারদর ভেঙে পড়ায় এখন লোকসানে ডুবে আছেন।
লোকমানের হিসাবে, প্রতি একরে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ টাকা। আশা ছিল ২৫ টাকা দরে বিক্রি করবেন। কিন্তু মৌসুমে অর্ধেক আলু বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ১৫ টাকায়। বাকি আলু হিমাগার ও বাড়িতে রেখে ধীরে ধীরে বিক্রি করেও সর্বোচ্চ দাম পেয়েছেন ২০ টাকা।
তিনি বলেন, ‘হিমাগারে রেখেছিলাম বেশি দামে বিক্রি করব ভেবে। এখন ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করছি। খরচই উঠছে না।’
আলুচাষে নেওয়া ৩ লাখ টাকার ঋণের মাসিক ৯ হাজার টাকা সুদ দিচ্ছেন লোকমান। ‘পুঁজির ৭০ শতাংশ হারিয়েছি। এখন জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে হবে,’ বলেন তিনি।
লোকমানের মতো লালমনিরহাটের অনেক আলুচাষিই এবার লোকসানে পড়েছেন। কেউ ঋণের চাপে গ্রাম ছাড়ছেন, কেউ অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
আদিতমারীর নামুড়ির একাব্বর আলী জানান, তিন একর জমিতে আলু চাষে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। লোকসান হওয়ায় ঋণদাতারা এখন ঘন ঘন বাড়িতে আসছেন। ‘অন্যান্য ফসল আবাদ করে এই ঋণ শোধ করতে হবে,’ বলেন তিনি। কালীগঞ্জের খায়রুল ইসলামের সাত একর জমিতে চাষে ব্যয় হয়েছিল ১৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা। উৎপাদন পান ৬৩ হাজার কেজি। এর মধ্যে মৌসুমে ২৩ হাজার কেজি ১৪ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। ৪০ হাজার কেজি হিমাগারে রাখতে পরিবহনসহ খরচ হয়েছে ৪ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তার হিমাগারে এখনো ১০ হাজার কেজি আলু মজুত আছে।
রংপুর বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিভাগে দুই লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে চার লাখেরও বেশি কৃষক আলু চাষ করেছেন। উৎপাদন হয়েছে ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টন। বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে সংরক্ষিত আছে ১১ লাখ টন আলু—যার ৪০ শতাংশ এখনো মজুত রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারদরে ধস নামার পরও সরকারঘোষিত ৫০ হাজার টন আলু ন্যায্যমূল্যে কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
কালীগঞ্জের লিখন মিয়া বলেন, ‘সরকার দ্রুত আলু ক্রয় শুরু করুক। নাহলে কৃষক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হিমাগারগুলো ডিসেম্বর পর্যন্ত চালু রাখতে হবে।’
চাষি হাসিনুল ইসলাম বলেন, ‘লাগাতার লোকসানে আমরা ক্ষুদ্র কৃষকেরা দিশেহারা। সরকারের আলু ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে।’
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনলে তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন। না হলে আগামী মৌসুমে আলুচাষ নিরুৎসাহিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উৎপাদনের তুলনায় হিমাগার কম হওয়ায় সংরক্ষণ ব্যাহত হয়, ফলে বাজারে আলুর সরবরাহ বেড়ে দর আরও পড়ে যায়। পরিকল্পিত চাষ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখন জরুরি।’