ভূমিকম্পে ‘আফটারশক’ কী—এটি বোঝার জন্য আগে জানতে হয় ভূমিকম্পের ভেতরের কার্যপ্রণালী কীভাবে চলে। ভূমিকম্প মূলত পৃথিবীর ভূত্বকের দুই বা ততোধিক টেকটোনিক প্লেটের ভাঙন ও হঠাৎ সরে যাওয়ার ফল। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা চাপ যখন এক মুহূর্তে মুক্তি পায়, তখন যে বড় ধাক্কা অনুভূত হয় তাকে বলা হয় মেইনশক বা মূল ভূমিকম্প। কিন্তু ভূত্বকের ভাঙা অংশগুলো এই ধাক্কা পেয়েই স্থিতিশীল হয়ে যায় না। বরং তখনই তাদের ভেতরে একটি অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থির ভূস্তর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পুনর্বিন্যাস করতে শুরু করে—যার ফলে আবারও ছোট-বড় ধাক্কা অনুভূত হয়। এই পরবর্তী কম্পনগুলোকেই বলা হয় আফটারশক। অর্থাৎ আফটারশক মূল ভূমিকম্পের পরবর্তী ‘পরিণতি’। এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক চাপ পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়ার কারণে ঘটে।
আফটার শক কেন ঘটে
আফটারশক সাধারণত ভূমিকম্প-ঘটিত ফাটলের আশপাশে ঘটে। ফাটলের সীমানায় শক্তি দ্রুত মুক্ত হওয়ার পরও আশেপাশের শিলাস্তরগুলো নতুন অবস্থানে পৌঁছাতে বারবার চেষ্টা করে, কখনও মিলিমিটার পরিমাণেও সরে যায়, আর এই ক্ষুদ্র নড়াচড়াগুলিই কম্পনের সৃষ্টি করে। বড় ভূমিকম্প হলে এই পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, তাই আফটারশকের সংখ্যাও বেশি হয়। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা এবং প্রথম কয়েক দিন থাকে সবচেয়ে সক্রিয়। সময় যত এগোয়, ভূত্বকের নতুন অবস্থান স্থির হতে থাকে, ফলে আফটারশকের তীব্রতা ও ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পরে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত আফটারশক চলতে পারে, বিশেষ করে যদি ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো দুর্বল বা ফাটল জটিল হয়।
আফটারশক কি বিপদজনক
বিপদের দিক থেকে আফটারশককে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। মূল ভূমিকম্পের পর দুর্বল হয়ে পড়া ভবন, সেতু বা অবকাঠামো অনেক সময় অল্প একটি আফটারশকেও ধসে যেতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক অভ্যাস অনুযায়ী বড় ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকর্মীরা ভবনে প্রবেশের আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেন এবং পুরো এলাকা কাঠামোগতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। কারণ, একটি মাঝারি মাত্রার আফটারশকও এমন ভবনে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে যা প্রথম আঘাতেই ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ প্রায়ই মনে করে আফটারশক মানেই নতুন ভূমিকম্প, কিন্তু মূলত তা নয়। এটি মূল ভূমিকম্পেরই ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া। এতে বোঝা যায় ভূত্বকের অভ্যন্তরে চাপ এখনও পুরোপুরি স্থিত হয়নি। ভূমিকম্প বিজ্ঞানীরা এই আফটারশক বিশ্লেষণ করে ফাটলের সীমানা কতটা বিস্তৃত, কোন দিকে প্লেটের চাপ বেশি এবং ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের আচরণ কেমন হতে পারে, এসব বিষয়ে উন্নত ধারণা পান।
ভূমিকম্পের পর ভূতাত্ত্বিক স্তরের স্বাভাবিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ারই অংশ। ভূমিকম্পের পরে কর্তৃপক্ষ সাধারণত মানুষকে খোলা স্থানে থাকতে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে না ঢুকতে এবং সম্ভাব্য আফটারশক সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলে। কারণ এই ধাক্কাগুলো ছোট হলেও দুর্বল স্থাপনার ওপর এর প্রভাব বড় হতে পারে। তাই আফটারশককে মূল ভূমিকম্পের মতো ক্ষণস্থায়ী ঘটনা মনে না করে, পরবর্তী ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।