চট্টগ্রাম নগরী যেন এক নিদারুণ অদৃশ্য বিপদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে,এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন দেশের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে শহরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। সম্ভাব্য প্রাণহানি লাখের ঘর ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় টেকটনিক প্লেটের ঠিক সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘বার্মিজ–ইন্ডিয়ান’, ‘বাংলাদেশ–ইন্ডিয়ান’ ও ‘বাংলাদেশ–মিয়ানমার (ইউরেশিয়ান)’। যার কারণে দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের দাবি, চট্টগ্রামের ভূগর্ভেও একটি মাইনর টেকটনিক প্লেট সক্রিয় অবস্থায় আছে, যা বড় ধরনের ধাক্কা সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর ঘোড়াশাল এলাকায় উৎপত্তিস্থল হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও অনুভূত হয়। যদিও নগরীতে বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও নগরবাসীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ছোট–বড় মিলিয়ে ২১২ বার ভূকম্পন রেকর্ড হয়েছে। এতে বোঝা যায় ভূ-প্লেটগুলোর অস্বাভাবিক নড়াচড়া অব্যাহত রয়েছে। তাদের মতে, চট্টগ্রামের পুরোনো ভবনগুলোর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। নগরীর প্রায় ৫০ থেকে ১০০ বছর বয়সী ভবনের বড় একটি অংশই ঝুঁকিপূর্ণ কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ। এমনকি নতুন নির্মিত বহু বহুতল ভবনেও ভূমিকম্প–প্রতিরোধী নকশা অনুসরণ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জানায়, নগরীতে বর্তমানে বহুতল ভবনের সংখ্যা ৪ লাখ ১ হাজার ৭২১টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৪৮০টি ভবন ৬ থেকে ১০ তলা, আর ৪৮৪টি ১০ তলার বেশি। কিন্তু একটি বড় অংশেই জাতীয় বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। উপকূলীয় আবহাওয়ার কারণে নির্মাণসামগ্রী দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবনগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাছাড়া চট্টগ্রামের সংকীর্ণ সড়ক, এলোমেলো নগরায়ন ও সীমিত উদ্ধার সক্ষমতা বড় ধরনের দুর্যোগে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলবে।
গত চার বছরে দেশের ভেতরে ৩৭টি ভূকম্পন ঘটলেও বড় ধরণের ক্ষতি হয়নি। তবে শুক্রবারের ভূমিকম্পে রাজধানী ও চট্টগ্রাম, উভয় অঞ্চলের কাঠামোগত দুর্বলতার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই ভবন পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত ও পুনর্নির্মাণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চট্টগ্রাম পরিণত হতে পারে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের নগরীতে।