সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এইচআইভি বা এইডস আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৫২ জনের বেশি এইডসে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ জনই শিক্ষার্থী। আক্রান্ত এই শিক্ষার্থীদের বয়স ১৭ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। এই পরিসংখ্যান গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ইন্টারনেট ব্যবহারে সর্তকতা, সামাজিক ও ধর্মীয় জ্ঞানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়া ৫২ জনের মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ এবং আটজন নারী। আক্রান্তদের মধ্যে ২১ জনই শিক্ষার্থী। যেখানে গত বছর মোট ২৫ জন আক্রান্তের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিল ১২ জন। সেখানে চলতি বছর সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জন সমকামী।
বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতালের এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টারে মোট ২৪৮ জন এইডস আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই রোগীদের মধ্যে শুধু যশোর নয়, খুলনা বিভাগের অন্যান্য জেলার মানুষও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি সবাইকে চিন্তিত করে তুলেছে। তবে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের এইচআইভি কাউন্সিলর সহ-প্রশাসক সুদেব কুমার বিশ্বাস বলেন, যশোরে যে সংখ্যায় এইআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সে তুলনায় যদি কাউন্সিলিং না রাখা হয়, তাহলে এটা মহামারি আকার ধারণ করবে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪০-৫০ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আছে সাধারণ মানুষ, সমকামী, শিক্ষার্থী, প্রবাসী। আক্রান্তদের কাউন্সিলিংয়ের জন্য বাইরের দেশে থেকে ওষুধ আনতে হয়। এভাবে ওষুধ আমদানি করতে হলে তো দেশের অর্থনীতিও প্রভাবিত হবে। এ জন্য কাউন্সিলিংয়ে রাখলে রোগটি ছড়াবে না, নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
তরুণদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্তের হার বর্তমানে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তাদের কৌতূহল এখন বিপরীত লিঙ্গের চেয়ে সহলিঙ্গের প্রতি বেশি দেখা যাচ্ছে, যা এক ধরনের সামাজিক চক্রান্তের ফল। ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের প্রভাবেই এমন প্রবণতা বাড়ছে।
এআরটি সেন্টারের সমন্বয়কারী কানিজ ফাতেমা বলেন, বর্তমানে এইচআইভি মহামারি আকারে বাড়ছে। এর মধ্যে উদ্বেগজনক হলো শিক্ষার্থীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থী বলতে ১৮-২৬ বছর বয়সীদের বোঝাচ্ছি। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা কম। আর সবথেকে বেশি রোগী পাচ্ছি সমকামী।
এই সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পারিবারিক নীতিবোধ, মূল্যবোধ বর্তমান সমাজে অনেক কমে গেছে। আমরা সন্তানদের অনেক স্বাধীনতা দেই, তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশছি। কিন্তু তারা কার সঙ্গে, কাদের সঙ্গে মিশছে সেই বিষয়গুলো আমরা মোটে দেখার চেষ্টা করিনা। আমরা তাদের বন্ধ হিসেবেই থাকব, কিন্তু তাদের যে নীতিশিক্ষা, মূল্যবোধ এগুলা যেন পরিবার থেকে আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
এছাড়া ইন্টারনেটের ব্যবহারের বিষয়ে বাবা-মায়েদের সচেতন থাকবে পরামর্শ দেন কানিজ ফাতেমা। একই সঙ্গে সন্তানদের যৌনশিক্ষার যেমন নিরাপদ যৌন মিলনের বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া উচত বলে জানান তিনি।
সামাজিক মূল্যবোধ ধর্ম ও শিক্ষার অভাবে দিন দিন এইচআইভি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারিবারিক ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এ থেকে প্রত্যাবা পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব
সরকারি এম এম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন বলেন, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের ফল এখন ভোগ করছি। মূল্যবোধের সবচেয়ে বড় জায়গাটা হলো ধর্ম। যার যার ধর্মকে বাইপাস করা চেষ্টা করার একটা নির্মম পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে (যশোর) সমকামীতার মাধ্যমে এই রোগটা বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়াও এর মূল কারণ বলে মনে করে তিনি।
যশোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে এইডস আক্রান্ত হওয়ার সোর্স আছে। যারা আক্রান্ত হয়েছে সবাই উঠতি বয়সী। বিশেষ করে কলেজ বা স্কুল পড়ুয়া। এই বয়সী মানুষদের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি একটা আকর্ষণ থাকে। আর অবাধ ইন্টারনেট থাকায় অনলাইনে বিভিন্ন পর্ণসাইট দেখার কারণে মনের মধ্যে আগ্রহও জাগে। এ কারণেই তারা বিপথে চলে যায়।
এই সংক্রমণ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে পরিবারের সচেতনতাকেই প্রাধান্য দেন তিনি। বলেন, সবার প্রথমে আমাদের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। আমার ছেলে-মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে আমাকেই দেখভাল করতে হবে। তা নাহলে অন্যজনের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। আর গ্রাম থেকে যারা কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তারা নিজেরাই নিজের অভিভাবক। মা-বাবার পক্ষে তাকে গ্রাম থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। সুতরাং এ বিষয়ে সবার সচেতন থাকা প্রয়োজন আছে।
যশোরের জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ ৪৬ হাজার। সেই হিসাবে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় একজন এইচআইভি/এইডস রোগী রয়েছেন। এ বছর এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত হয়ে ৪ জন মারা গেছেন ।